তদন্ত শেষ, ভিসির হাতে আটকা ‘নিপীড়ক’ জনির বিচার

জাবি
  © সংগৃহীত

যৌন নিপীড়নের একাধিক অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেড় বছর ধরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জনি। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক এই সভাপতির বিচার উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম ঝুলিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

গত শনিবার রাতে জাহাঙ্গীরনগরের মীর মশাররফ হোসেন হলে এক ব্যক্তিকে আটকে তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণের মামলায় মোস্তাফিজুর রহমানসহ ছাত্রলীগ চার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের পর নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিনামায় মাহমুদুর রহমান জনির চাকরিচ্যুতিও রয়েছে। 

তাঁদের ভাষ্য, তদন্ত কমিটি এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। স্ট্রাকচার্ড কমিটির কাছেও লিখিত বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান জনি দায় স্বীকার করেছেন। কিন্তু সাময়িক বরখাস্ত দূরে থাক, তাঁর বিচার সম্পন্ন করছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

স্ট্রাকচার্ড কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, মাহমুদুর রহমান জনি নিজেই অপরাধ স্বীকার করেছেন। কমিটির সদস্যরাও নিশ্চিত হয়েছি, তিনি অপরাধী। তাঁর কঠিন শাস্তি হবে। এখন উপাচার্য (ভিসি) চাইলে, বিচার শেষ করতে পারেন। এখন পর্যন্ত কমিটির পাঁচটি সভা হয়েছে। গত সোমবার ষষ্ঠ সভা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভিসি সভা স্থগিত করেন।’

এই সদস্যের ভাষ্য, ভিসি আগের সভাগুলোতে বলেছেন তিনিও বিচার চান। কিন্তু পরে আর কথা বলেন না, এড়িয়ে যান। ভিসি স্ট্রাকচার্ড কমিটির প্রধান। তাঁর সম্মতি ছাড়া বিষয়টি সিন্ডিকেটে উত্থাপন করা যায় না। 

নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চের মানববন্ধনে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পারভীন জলি বলেন, দেড় বছর পার হলেও মাহমুদর রহমান জনির মতো যৌন নিপীড়কের বিচার হয়নি৷ তিনি বীরদর্পে প্রশাসনের প্রভাবশালী শিক্ষকদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ান। দোষ প্রমাণিত হলেও জনির বিচারে সব নিয়ম ভঙ্গ করেছে প্রশাসন। এতেই বুঝা যায়, কারা ক্যাম্পাসকে ধর্ষক, সন্ত্রাসী, খুনিদের অভয়রণ্যে পরিণত করেছে। ধর্ষক ও নিপীড়কদের বিচার করার সদিচ্ছা নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। তা দেখে শিক্ষার্থীরা শিখছে, ধর্ষণ-নিপীড়ন করলে বিচার হয় না ৷ 

মাহমুদুর রহমান জনি পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৩৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি হন। ২০১৮ সালে প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। তখন থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠে। ২০২২ সালের ২১ এক শিক্ষিকার সঙ্গে তাঁর ছবি ছড়ায়। অভিযোগ উঠে জনির প্রভাবে নিয়োগ পেয়েছেন ওই শিক্ষিকা। 

শিক্ষক পদে আবেদনকারী ৪৩ ব্যাচের এক ছাত্রীর সঙ্গে মাহমুদুর রহমান জনির কথিত কথপোকথন ছাড়ায়। এতে শোনা যায়, ভুক্তভোগীকে জোর করে গর্ভপাত করান মাহমুদুর রহমান জনি। ছাত্রলীগের একাধিক নেত্রীর সঙ্গে তাঁর ‘অনৈতিক’ সম্পর্ক এবং ‘অশালীন’ চ্যাটিংয়ের ছবি ও তথ্য, ওই সময়ে প্রকাশ্যে এসেছিল। 

এরপর আন্দোলনের মুখে ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রাথমিক তদন্ত কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে সহকারী প্রক্টরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন মাহমুদুর রহমান জনি। তদন্ত কমিটি গঠন করায় তিনি ভিসিকে গালাগাল করছেন, এমন একটি অডিও ছড়ায় তখন। ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপে মাহমুদুর রহমান জনিকে দম্ভোক্তি করে বলতে শোনা যায়, ‘ওই …... (উপাচার্য) যে আমার জন্য চেয়ারে বসেছে, সেটা সে ভুলে গেছে।’

পরে ইউজিসিতে স্মারকলিপি দেয় মহিলা পরিষদ। মাহমুদুর রহমান জনির বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দেয় ইউজিসি। গত বছরের ১৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার বাইরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। সেদিন সিন্ডিকেট জানায়, প্রাথমিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পূর্ণাঙ্গ হয়নি। অধিকতর তদন্তে ফের কমিটি করে সিন্ডিকেট। ওই কমিটি প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া স্ট্রাকচার্ড কমিটি করা হয় গত আগস্টে। 

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযাযী, ৬ সদস্যের স্ট্রাকচার্ড কমিটি সভাপতি উপাচার্য নিজেই। অপর সদস্যরা হলেন, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক নুহু আলম, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান মাহফুজা মোবারক এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক লায়েক সাজ্জাদ এন্দেল্লাহ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক আশরাফ-উল আলম।

নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত কমিটি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় মাহমুদুর রহমান জনিকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। শেষ হচ্ছে না স্ট্রাকচার্ড কমিটির কার্যক্রমও। বিষয়টি যাচ্ছে না যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলেও। 

এ বিষয়ে সেলের সভাপতি ও লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবউননেছা বলেনে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমি খুব কঠোর। ২০২২ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর ১৩ অভিযোগের ১১টি নিষ্পত্তি করেছি। নিয়ম অনুযায়ী মাহমুদুর রহমান জনির বিষয়টি সেলে আসার কথা থাকলেও, প্রশাসন পাঠাচ্ছে না। তারা ধারণা করেছে, আমি ছাড় দিবো না। কালক্ষেপণও করবো না। শাস্তির সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেবো। এজন্যই হয়ত সেলে পাঠানো হয়নি।

উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, সদিচ্ছার অভাব বা পিছুটান নেই। সোমবার ঢাকায় মিটিং থাকায় স্ট্রাকচার্ড কমিটির সভা বাতিল করতে হয়েছে। আমিও চাই দোষীদের বিচার হোক। আশা করি, দুইদিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে পারব। 


মন্তব্য


সর্বশেষ সংবাদ