ফের চক্রাকারে বাস চালুর দাবি,স্থানীয় সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি চবি শিক্ষার্থীরা

চবি
  © টিবিএম ফটো

ক্যাম্পাস শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় চবি ক্যাম্পাস এবং শহরে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম শাটল ট্রেন।কিন্তু পর্যাপ্ত নিজস্ব বাস থাকলেও নেই ক্যাম্পাসের ভিতরে চক্রাকারে বাস সার্ভিস। অতীতে চালু থাকলেও সিন্ডিকেট ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষার অযুহাতে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ছাত্র বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে ছাত্র ছাত্রীদের বিশাল ক্যাম্পাসে চলাচল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময় সাপেক্ষে ও দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।ক্যাম্পাসের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য আছে রিকশা, অটোরিকশা এবং সিএনজি।তবে এখানেই যত বিপত্তি, পান থেকে চুন খসলেই বন্ধ করে দেওয়া হয় রিকশা,অটোরিকশা। স্থায়ীয়দের দ্বারা হামলা ,সিএনজি ড্রাইভার ও রিকশা চালকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কে কেন্দ্র করে হাতাহাতি মারামারি এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে। গত এক বছরে একাধিক বার শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা ঘটে।সর্বশেষ গত ১৫ মার্চ স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে আহত হয় ৫ চবি শিক্ষার্থী। বারবারের মতো বন্ধ করে দেওয়া হয় যান চলাচল। স্থানীয় সিন্ডিকেট আর চালকদের কাছে চবি শিক্ষার্থীদের এ যেন এক অসহায় আত্মসমর্পণ।এই বিড়ম্বনা থেকে বের হতে চক্রাকারে বাস চালু করা নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী  মুরাদ হোসেন আহাদ বলেন-আমাদের ২৩০০ একরের বিশাল ক্যাম্পাসে চলাচল করা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।অনেক সময় রিকশা অটোরিকশা বন্ধ থাকলে হল থেকে ফ্যাকাল্টিতে সময় মতো যাওয়া সম্ভব হয় না ক্লাস কিংবা পরীক্ষাতেও লেইট হয়ে যায়।ছাত্র বাস গুলো চালু হলে অল্প সময়ে সহজে আমরা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে চলাচল করতে পারতাম । আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী সাদমান সাকিব সুপ্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ব্যাপারটি সামনে এনে বলেন- আমরা সবাই ছাত্র, আমাদের পরিবার থেকে সীমিত অর্থ এনে পড়াশোনা করতে হয়। ক্যাম্পাসের ভিতরে সিএনজি ও রিকশার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মাধ্যেমে আর্থিক একটা প্রভাব আমাদের মাঝে পড়ছে।লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ প্রধান স্থানীয় ড্রাইভারদের সাথে ছাত্রদের প্রায় সময়ে ঘটে যাওয়া মারামারি,কথা কাটাকাটির কারন হিসেবে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত ভাড়া আদয় এবং বাস চলাচল বন্ধ থাকা কে দায়ী করেন। দর্শন বিভাগের ছাত্রী সুরভিত শাম্মী বলেন- অনেক দিন ধরেই আমরা মানববন্ধন সহ অনেক আন্দোলন করছি প্রশাসনের আশ্বাস থাকলেও বাস চলাচল নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।চবি ক্যাম্পাসে শিক্ষক বাসের পাশাপাশি ছাত্র ছাত্রী দের জন্য বাস চালু করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।বাস থাকলে আমাদের ক্যাম্পাসে চলাচল করতে অনেক সুবিধা হতো।গত কয়েক দিন আগেও ছাত্র -স্থানীয় লোকজন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং পরবর্তীতে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী শাহিনুর ইসলাম ক্যাম্পাসের ভিতরে চক্রাকারে  বাস চালু করা সময়ের দাবি বলে মনে করেন। মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রেফায়েত উল্লাহ রূপক বলেন -প্রশাসনের উচিত চক্রাকারে বাস চালু করার ব্যবস্থা করা। বারবার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, কিংবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়ানো কখনও প্রত্যাশিত না।আমরা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি সবারই কস্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার থাকে। রিকশা, অটোরিকশা বা সিএনজি চালকরা হঠাৎ করে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়ে অথবা সিন্ডিকেট করে বন্ধ করে রাখে যার জন্য প্রায় সময়ই আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
 
একসময় চবি ক্যাম্পাসের ভিতরে চক্রাকারে ছাত্র বাস সার্ভিস চালু ছিল।জিরো পয়েন্ট থেকে এক নম্বর গেট প্রতি আধাঘন্টায় একবার করে আপডাউন করতো।সোহরাওয়ার্দী মোড় থেকে ছেড়ে আইন অনুষদ হয়ে চক্রাকারে আবার সোহরাওয়ার্দী মোড়ে ফিরতো। ২০ মিনিট পর পর গাড়ি গুলো একবার ঘুরে আসতো।কিন্তু সবুজ ক্যাম্পাসে বিচরন করা অসংখ্য প্রানীর অস্তিত্ব রক্ষা,বাজেট কমানো এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের জন্য বন্ধ হয়ে যায়‌।

২০২২ সালের ১৫ এপ্রিল ক্যাম্পাসে ছাত্র বাস চালুর দাবিতে মানববন্ধন হলে এই ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী প্রক্টর শহীদুল ইসলাম বলেছিলেন- ক্যাম্পাসে এক সময় বাস চলতো।গত ২৫  বছর আগে খরচ কমানো এবং ক্যাম্পাসের জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় যানবহন চলাচল(ইঞ্জিন চলিত বাহন) সীমিত করা হয়।তখন ছাত্র বাস গুলো বন্ধ হয়ে যায়। তবে শিক্ষার্থীরা চাইলে আমরা ইউজিসি কে আবারো বাস চালু করার বিষয়ে জানাবো।আশ্বাসের প্রায় দুই বছর পরেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন।
মোটা দাগে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব, স্থানীয় কর্তা ব্যক্তিদের প্রভাবে সৃষ্ট সিন্ডিকেট এবং কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তার নিজস্ব সিএনজি, অটোরিকশা ভাড়া দেওয়া আছে বলেই বাস সার্ভিসটি বন্ধ আছে বলে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি সময়ে অসময়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি টেনে আনেন।

ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে চক্রাকারে বাস চালু করার বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মুহাম্মদ রোমান দৈনিক জনবানীকে জানান-ক্যাম্পাসের ভিতরে চক্রাকারে বাস চালুর ব্যাপারটির সাথে বেশ কয়েক টি দফতর জড়িত এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। তবে আশা করছি অতি দ্রুত কাজটি শুরু হবে। বারবার স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষের ঘটনাটি অন্তত্য দুঃখজনক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন- সহকারী প্রক্টর হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবং একজন শিক্ষক হিসেবে ব্যক্তিগত ভাবে একজন শিক্ষার্থীও আহত হোক এটা কখনোই প্রত্যাশিত নয়। কারন দেশের সেরা মেধাবীদের আশ্রয়স্থল এই বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।আমরা আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর নিচ্ছি। স্থানীয়দের সাথে শনিবার (১৬ মার্চ) আমরা বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।বাড়তি ভাড়া আদায় সম্পর্কে তিনি বলেন- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে,হুটহাট নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায় করার কোনো সুযোগ নেই।


মন্তব্য