সীমান্তে দুইজন নিহতের পর হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া

মিয়ানমার
  © ফাইল ছবি

মিয়ানমারের অভ্যন্তীরণ সংঘাতের মধ্যে দেশটি থেকে ছোঁড়া মর্টার শেল পড়ে গতকাল সোমবার দুপুরেই তমব্রু বাজারের পাশের ওয়ার্ডে দুজন নিহত হয়েছেন। এরপর রাতভর ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী (মিয়ানমারের) এলাকায় গোলাগুলি চলতে থাকে। এমন পরিস্থিতি সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মানুষজন নিরাপদে সরে গিয়েছেন।

তমব্রু বাজারে প্রায় ৪০টির মতো দোকান আছে। বাজারের পাশের কোনারপাড়া, হিন্দুপাড়া সীমান্তের জিরো পয়েন্ট নিকটবর্তী। এই এলাকায় অনেক বাড়ি-ঘরে মর্টার শেল, গুলিও পড়েছিল। সোমবার রাতে তুমুল গোলাগুলির পর হাজার হাজার মানুষ নিজ দায়িত্বে নিরাপদে সরে গিয়েছেন। এ বাজারের দোকানিরা আজ মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে কিছু দোকান খোলার চেষ্টা করেন। তবে গোলাগুলির আতঙ্কে তা আবারো বন্ধ করে দেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সবাইকে নিরাপদে সরে যেতে বলা হয়েছে। 

তমব্রু বাজারে দোকানি দিল মোহাম্মদ বলেন, "ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আমাদের নিরাপদে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। দোকানের গুরুত্বপূর্ণ মালামাল নিয়ে যাচ্ছি বাসায়।" 

তমব্রু বাজারের আরেক দোকানি নুরুল আলম বলেন, "আমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছি আরো তিন দিন আগে। তবে দোকান খোলা ছিল। কিন্তু, গতকাল দুজন নিহত হওয়ার পর থেকে মিয়ানমারের ওদিক থেকে গোলাগুলি অনেক বেড়ে যায়। এজন্য এখানে এখন কোন মানুষ নেই। সবাই নিরাপদে চলে গেছে। অবস্থা খুব খারাপ।"

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শান্তনু কুমার দাশ। তিনি বলেন, "আমরা দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বসতির লোকজনকে নিরাপদে সরাতে।" তবে কী পরিমাণ লোকজন নিরাপদে আশ্রয়ের ঘর-বাড়ি ত্যাগ করেছেন, তা জানাতে পারেননি তিনি। 

গত তিন দিন ধরে সীমান্তে সংঘাত চলছে। সোমবার বাংলাদেশে দুজন নিহতও হয়েছে। সংঘাতের কারণে ঘুমধুম সীমান্তের বহু মানুষ ঘড়-ছাড়া। মঙ্গলবার ভোর থেকে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্ত দিয়ে গোলাগুলির শব্দ বেশি শোনা যাচ্ছে। ভোরে এই সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির ১১৬ জনসহ মোট ২৬৪ জনকে নিরাপদে নিজেদের  জিম্মায় নিয়েছে বিজিবি।

ঘুমধুম মৈত্রী সড়কের পাশে অবস্থিত নয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "আমাদের এখানে অনেক বেশি গোলাগুলি চলছে। বিশেষ করে, সোমবার সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে গোলাগুলির মুহুর্মুহু শব্দ শোনা যাচ্ছে। গুলি এসে বাড়িঘরে পড়েছে। এজন্য পরিবার নিয়ে আমরা এলাকা ছেড়েছি। আমাদের পাড়ার সব ঘর-বাড়ি এখন মানুষশূন্য।"

স্থানীয় ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "গত তিন দিন আমার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে তেমন ঝামেলা হয়নি। তবে সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে অবস্থা বেশি খারাপ। মানুষজন যে যার মতো নিরাপদে চলে গেছে।"

শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে সীমান্ত শিবির দখলকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী দলগুলোর সংঘর্ষ চলছে। ক্রমাগত গুলি, মর্টার শেল ও রকেট বিস্ফোরিত হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে আসা গোলায় বাংলাদেশের বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় এক বাংলাদেশিসহ দুজন নিহত হয়েছেন। 

বাংলাদেশের সীমান্তে দুজন নিহত হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্রমশ আতঙ্ক বাড়ছে। সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যার পর থেকে সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা বেড়ে চলছে। স্থানীয় ঘুমধুম ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ির মানুষজন নিরাপদ আশ্রয়ে সরতে শুরু করেছেন।

গত তিন দিনের সংঘাতের সীমান্ত-লাগোয়া বিভিন্ন এলাকায় গুলি বা মর্টার শেষ পড়লেও সোমবার দুপুরে মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত শনিবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে ঢেঁকিবনিয়ার পাশে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) তুমব্রু রাইট ক্যাম্প দখলকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির সঙ্গে গোলাগুলি শুরু হয়। তুমব্রু রাইট ক্যাম্প সীমান্তচৌকিটি বাংলাদেশের বান্দরবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলার লোকালয়ের একদম কাছাকাছি।

ঢেঁকিবনিয়া সীমান্তচৌকি থেকে বাংলাদেশের লোকালয় প্রায় ৮০০ মিটার দূরে। ঢেঁকিবনিয়া ও ঘুমধুমের মাঝখানে নাফ নদীর সরু একটি শাখা ও প্যারাবন রয়েছে। এ কারণে তুমব্রু রাইট ক্যাম্পে গোলাগুলির সময় বাংলাদেশের বসতঘরে গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়েছে। সংঘর্ষের জেরে সীমান্ত-লাগায়ো বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। 

থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের গণমাধ্যম দ্য ইরাবতীর প্রতিবেদন অনুসারে, গত চার দিনে রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বেশিরভাগ ঘাঁটি আরাকান আর্মি দখল করে নিয়েছে। এ পর্যন্ত সংঘাতে জান্তা বাহিনীর অন্তত ৬২ জন সৈন্য নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। 

পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) এবং সশস্ত্র সংগঠনগুলো মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল ও রাজ্য, সাগাইং, মগওয়ে এবং মান্দালয় অঞ্চলের পাশাপাশি কাচিন ও কারেন রাজ্যে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তাদের হামলা জোরদার করার কারণে এই হতাহতের ঘটনা ঘটছে।


মন্তব্য


সর্বশেষ সংবাদ