চাচাতো বোনকে বিয়ে করার কারণেই লাশ হয়েছেন সৌরভ!

সৌরভ
  © সংগৃহীত

ময়মনসিংহে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক সৌরভ (২৪) হত্যাকাণ্ডে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এর আগে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার সুতিয়া নদীতে মনতলা সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ওমর ফারুক সৌরভের খণ্ডিত লাশ।

ধারণা করা হচ্ছে, আপন চাচাতো বোন ইসরাত জাহান ইভাকে বিয়ে করাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধে সৌরভকে খুন করা হয়েছে। এর পেছনে সৌরভের আপন চাচা ও ইভার বাবা ইলিয়াস আলী জড়িত বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রবিবার রাতে ইলিয়াস আলী ও তাঁর স্ত্রীকে হেফাজতে নিয়েছে বলে জানায় একটি সূত্র। তবে এখনও তাদের আটক বা গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি।   

পারিবারিক সূত্র জানায়, সৌরভের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তার আপন চাচাতো বোন ইসরাত জাহান ইভার। গত ১২ মে ইভা ঢাকায় গিয়ে গোপনে সৌরভকে বিয়ে করেন। এর পর ইভা ময়মনসিংহের নিজ বাসায় চলে আসেন। তাদের বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হতেই উভয় পরিবারের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। ১৬ মে ইভাকে জোর করে কানাডা পাঠিয়ে দেয় তাঁর পরিবার। এর মধ্যেই ইভার বাবা ইলিয়াস আলী আপন বড় ভাই সৌরভের বাবা ইউসুফ আলীকে হুমকিধমকি দিচ্ছিলেন। ইভা ইলিয়াস আলীর একমাত্র মেয়ে।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে চাচা ইলিয়াস পরিকল্পিতভাবে সৌরভকে ডেকে এনে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন নিহতের বাবা অবসরপ্রাপ্ত ডাক বিভাগের কর্মচারী মো: ইউসুফ আলী। তিনি বলেন, ‘যে ভাইকে বাবার স্নেহ দিয়ে বড় করেছি; সেই ভাই আমার সন্তানকে হত্যা করল! সেটা বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার সন্তানকে না মেরে আমাকে মারত, ওর কী দোষ ছিল? শুধু কি আমার ছেলে ওর মেয়েকে ভালোবেসেছে, ওর মেয়ে কি ভালোবাসে নাই। যদি ওর মেয়ে ভালো নাই বাসত, তাহলে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় গিয়ে কেন আমার ছেলেকে বিয়ে করল?’ এসব কথা বলতে বলতে কোতোয়ালি থানায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন সৌরভের বাবা ইউসুফ আলী।

গতকাল সোমবার বিকেলে তিনি আরো জানান, সৌরভ ও ইভার প্রেমের বিয়ের ঘটনার কয়েক দিন পর ইলিয়াস তাকে ফোন করে হুমকি দিয়ে বলেছিল, তোর ছেলেকে টুকরো টুকরো করে খুন করব। এটা না করে পানিও খাব না। তখন তিনি ইলিয়াসের কথা বিশ্বাস করেননি। তিনি মনে করেছিলেন এটা তার রাগ-ক্ষোভের কথা। কিন্তু এখন তার কথাই সত্য হয়েছে। ছেলেকে টুকরো টুকরো করেই খুন করেছে। ছেলে খুনের বিচার চান তিনি। তিনি বলেন, ‘১৬ মে নিজের মেয়েকে কানাডায় পাঠিয়ে দিয়ে গত শনিবার সৌরভকে কৌশলে ডেকে ময়মনসিংহে আনেন। সৌরভ আমাদের কিছু না বলেই চলে আসে। ওই দিন রাতে শুনতে পাই সৌরভ ময়মনসিংহে এসেছে। কিন্তু রাত ১১টার পর যখন সৌরভের মোবাইল বন্ধ পাই, তখন থেকেই চিন্তা হচ্ছিল। পরে সকালে শুনি মনতলা ব্রিজের নিচে সৌরভের লাশের চার খণ্ড পাওয়া গেছে।’ একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা মাহমুদা আক্তার পারুল কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না।

এদিকে হুমকির সত্যতা নিশ্চিত করে নিহত সৌরভের প্রতিবেশী দাদা ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো: বোরহান উদ্দিন জানান, ইলিয়াস নিহত সৌরভকে টুকরো টুকরো করে খুন করার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই হুমকির অডিও কল রেকর্ড তিনি শুনেছেন এবং সংরক্ষণ করে রেখেছেন।

বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে ঢাকার মতিঝিলে থাকতেন সৌরভ। রাজধানীর প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের তারাটি গ্রামে। সৌরভের বাবা ইউসুফ আলী চাকরি করেন ডাক বিভাগে। মা মাহমুদা আক্তার পারুল গৃহিণী। রোববার ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে মনতলা সেতুর নিচে সুতিয়া নদীতে ভাসতে থাকা একটি লাগেজে এক যুবকের ত্রিখণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পাশেই উদ্ধার হয় পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মাথা। ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে পুরো এলাকায়। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় লাশের পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানায় গিয়ে সৌরভের পরিচয় নিশ্চিত করেন তাঁর বোন ফারজানা আক্তার। সৌরভের বন্ধুরা জানান, শনিবার দুপুরে ময়মনসিংহের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছিল সে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।

সৌরভের মায়ের অভিযোগ, ইলিয়াস তার মেয়ে ইভাকে কানাডা পাঠিয়ে দেয়ার পর সৌরভকে ডেকে এনে খুন করেছেন। তিনিও ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। স্বজনরা আরো জানান, গত ১২ মে ঢাকায় যান ইভা। পরে সৌরভের এক বন্ধুর বাসায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। বিয়ের পর সৌরভ তাদের বাসায় নিয়ে যান ইভাকে। ওই দিনই ইভা চলে আসেন ময়মনসিংহে। দু’দিন পর ময়মনসিংহে এসে চাচা-চাচীকে বুঝানোর চেষ্টা করেন সৌরভ। কিন্তু তারা বিয়ে মেনে না নিয়ে উল্টো তাকে হত্যার হুমকি দেন।

তদন্ত সূত্র জানায়, সুতিয়া নদীর যেখান থেকে সৌরভের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তার পাশেই রক্তে ভেজা বালিশ, জানালার পর্দা, কাঁথা, স্কচটেপ, গ্লাভসসহ বেশ কিছু আলামত পাওয়া গেছে। যা বিশ্লেষণ করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, সৌরভকে হত্যার পর খুনি ধারালো যন্ত্র দিয়ে তার মরদেহ টুকরো টুকরো করে। লাশের পরিচয় যেন কেউ শনাক্ত করতে না পারে, সে জন্য মাথা বিচ্ছিন্ন করে সেটা আলাদাভাবে গুমের চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া পরিচয় লুকাতে খুনি লাশের দুই হাতের আঙুলের চামড়া তুলে ফেলেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, গত শনিবার রাতে ওই তরুণকে হত্যা করে লাশ ফেলে যায় খুনি। 

ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই খুনিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। শিগগিরই এ হত্যারহস্য উদ্ঘাটিত হবে। 

পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মদ ভূঞা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় রোববার রাতে মামলা হয়েছে। খুনের রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।


মন্তব্য