ভিন্ন নামে ‘আনসার আল ইসলাম’এর তৎপরতা, টার্গেট উঠতি বয়সি কিশোর!

কক্সবাজার
  © টিবিএম

র‍্যাবের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার ‘আস-শাহাদাত’-এর তিন সদস্য। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম’ ভিন্ন নামে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছে। ‘আস-শাহাদাত’ নতুন নাম দিয়ে সদস্য সংগ্রহসহ নানা তৎপরতায় জড়িত সংগঠনের সক্রিয় তিন সদস্যকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য জানিয়েছে র‍্যাব। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত বাহিনীটির দুটি দল যৌথ অভিযান চালিয়ে কক্সবাজারের চৌফলদণ্ডী এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। র‍্যাব বলছে, অভিযানে ‘উগ্রবাদী’ বই, লিফলেট ও বিস্ফোরক তৈরির দ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।

শুক্রবার (২৮ জুন) দুপুরে কক্সবাজার র‍্যাব-১৫-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার আরাফাত ইসলাম এসব তথ্য জানান।

গ্রেপ্তাররা হলেন, জামালপুর জেলার ইসলামপুর এলাকার আবদুল ওহাবের ছেলে মো. জাকারিয়া মণ্ডল, ভোলা জেলার বোরহান উদ্দিন উপজেলার নুরুল আমিনের ছেলে মো. নিয়ামত উল্লাহ ও ফেনী জেলার সোনাগাজীর ইদ্রিস আলীর ছেলে মো. ওজায়ের। তাদের বয়স ১৯ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। তাদের নামে মামলা দিয়ে কক্সবাজার সদর থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব পরিচালক আরাফাত ইসলাম বলেন, ‘‘র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-১৫ ও র‍্যাব-৭ বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত চৌফলদণ্ডী এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে। তারা তিনজনই ‘আনসার আল ইসলাম’-এর সক্রিয় সদস্য। তারা আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে উদ্বুদ্ধ হয়ে আল কায়েদা মতাদর্শের জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলামে’ যোগদান করে।’’

এই গ্রুপের কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, ‘র‍্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের ফলে আনসার আল ইসলামের কার্যক্রম প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়ে। আনসার আল ইসলাম নামে নতুন সদস্য সংগ্রহসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যাহত হচ্ছে বিধায় তাদের কার্যক্রমকে চলমান রাখতে আনসার আল ইসলাম মতাদর্শী ‘আস-শাহাদাত’ নামে নতুন একটি জঙ্গি গ্রুপ তৈরি করে নতুন সদস্য সংগ্রহসহ দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।’

র‍্যাব পরিচালকের ভাষ্য, গ্রুপটি পার্শ্ববর্তী একটি দেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠনের সদস্য সংখ্যা আনুমানিক ৮৫ থেকে ১০০ জন। গ্রুপটির উদ্ভাবক হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশের নাগরিক হাবিবুল্লাহ এবং কথিত আমির সালাহউদ্দিন। তারা বাংলাদেশকে এই সংগঠনের একটি শাখা বলে দাবি করে। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশ বলতে প্রতিবেশী কোন দেশের কথা বলেছেন— তা পরিষ্কার করেননি তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘গ্রুপটির বাংলাদেশের আঞ্চলিক শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত আমির ছিলেন পূর্বে র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ইসমাইল হোসেন। গ্রুপের অন্যান্য সদস্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছে। তারা বিভিন্ন সময় অনলাইনে বিভিন্ন উগ্রবাদী নেতাদের বক্তব্য দেখে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংগঠনের সদস্যদের মাধ্যমে উক্ত সংগঠনে যোগদান করে। পরে তারা আনসার আল ইসলামের নাম ব্যবহার না করে ‘আস-শাহাদাত’ গ্রুপের নামে সদস্য সংগ্রহ ও দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।’

বাংলাদেশে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা এই জঙ্গিদের মূল উদ্দেশ্য— এমনটি জানিয়ে আরাফাত ইসলাম বলেন, ‘এই লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ভুল বুঝিয়ে সংগঠনের সদস্যদের ও নতুন সদস্য সংগ্রহ করে তাদের বিভিন্ন অপব্যাখা ও মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে দেশের বিচার ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিতৃষ্ণা তৈরি করে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের জন্য সদস্যদের উগ্রবাদী করে তুলত। এ উদ্দেশ্যে সংগঠনের সদস্যদের তারা বিভিন্ন উগ্রবাদী পুস্তিকা, মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ও উগ্রবাদী নেতাদের বক্তব্যের ভিডিও বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, টেলিগ্রাম ও বিপ গ্রুপের মাধ্যমে সরবরাহ করত। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় তারা ধর্মীয় স্থাপনা, বাসা বা বিভিন্ন স্থানে সদস্যদের নিয়ে গোপন সভা পরিচালনা করত।’

টার্গেট উঠতি বয়সি কিশোর! 

আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র‍্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃস্থানীয় অনেক সদস্য গ্রেপ্তার হয়। যেহেতু কিছুসংখ্যক সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে, তাই সংগঠনটিকে তারা পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন রিক্রুটিং করছে। উঠতি বয়সি কিশোরদের অপব্যাখা দিয়ে সহজে ব্রেনওয়াশের মাধ্যমে ভুল পথে নেওয়া যায় বিধায় কোমলমতি কিশোরদের তারা প্রথমে টার্গেট করত। তাই এই সংগঠনের বেশিরভাগ সদস্যই ১৯-২০ বছর বয়সি তরুণ এবং মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক।’

সাধারণ লেখাপড়ায় শিক্ষিত উগ্র মনোভাবাপন্ন লোকজনকে আকৃষ্ট করার জন্য দেশবিরোধিতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। এ সংগঠনে মাদ্রাসাশিক্ষক সদস্যগণ অত্যন্ত সুকৌশলে মাদ্রাসাপড়ুয়া কোমলমতি ছাত্রদের এ বিষয়ে অনুপ্রাণিত করত। এজন্য তারা সংগঠনের সদস্যদের গোপনে শারীরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করত বলে জানা যায়। জঙ্গি সংগঠনটির বাংলাদেশের পরবর্তী সম্ভাব্য আমিরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এরা কক্সবাজারে একত্রিত হয়েছিল, যোগ করেন তিনি।

গ্রেপ্তার জাকারিয়া ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার একটি মাদ্রাসার ছাত্র জানিয়ে র‍্যাব পরিচালক বলেন, ‘এক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনের আমির সালাহউদ্দিন ও ইসমাঈলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে পরিচয়সূত্রে সালাউদ্দিন ও বাংলাদেশের ইসমাইলের মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সে এই সংগঠনের যোগদান করে এবং দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। পরে সে আনসার আল ইসলাম মতাদর্শী ‘আস-শাহাদাত’ গ্রুপের ময়মনসিংহ ও জামালপুর অঞ্চলের দাওয়াতি শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়।’

অপর গ্রেপ্তার নিয়ামত ও ওজায়ের চট্টগ্রামের পটিয়ার একটি মাদ্রাসার কিতাব শাখায় অধ্যয়নরত জানিয়ে র‍্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে একজন জঙ্গি নেতার সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তারা উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে আনসার আল ইসলামে যোগদান করে এবং মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন এলাকায় দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।’


মন্তব্য