প্রতিদিনই বাড়ছে পণ্যের দাম

আমিষের চাহিদা পূরণে ভরসা মুরগির পা, পাখনা ও গিলা-কলিজা

পণ্যের
  © সংগৃহীত

কোনো ভাবেই পণ্যের দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সভা করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বাজারে কোনো প্রতিফলন নেই। পাশাপাশি একাধিক মন্ত্রীর অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও প্রতি সপ্তাহেই কিছু না কিছু পণ্যের দাম বাড়াছে। এ ছাড়া ডিসেম্বর থেকেই রোজার ৬ পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাড়তি চালের দামও। প্রতি কেজি সবজি কিনতে ক্রেতার সর্বনিম্ন ৬০ টাকা গুনতে হচ্ছে। আর কিছু সবজির কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। সঙ্গে ফের নাগালের বাইরে মাংসের দাম। আমিষের চাহিদা মেটাতে অনেকেই মুরগির পা, পাখনা ও গিলা-কলিজা কিনে খাচ্ছেন। আর এমন পরিস্থিতিতে আসছে রমজান মাস। ফলে ভোক্তাদের শঙ্কা-এ বছর রমজানেও বাড়তি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করবে অসাধু সেই সিন্ডিকেট।

এদিকে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির পক্ষ থেকে এবারের নির্বাচনি ইশতেহারেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের পরই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এক হয়ে কাজ করছে। মন্ত্রণালয়ের সভা শেষে সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রী পণ্যমূল্য কমাতে বাজারে অসাধুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন। তারপরও দাম কোনোভাবে কমছে না। বরং প্রতি সপ্তাহেই কিছু না কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে।

রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নভেম্বরে প্রতিকেজি চিনি ১৩৫ টাকা বিক্রি হলেও ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৪৫-১৫০ টাকা। চলতি বছর জানুয়ারিতেও একই দামে চিনি বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি ভালোমানের মসুর ডাল নভেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকা। ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৩৫ টাকা, আর জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা। প্রতিকেজি ছোলা নভেম্বরে বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকা। ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ৯০-৯৫ টাকা। জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা।

আরও পড়ুন: যেখানে দুর্নীতি সেখানেই ফেসবুক লাইভ করতে বললেন ব্যারিস্টার সুমন

ভোজ্যতেলের মধ্যে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল নভেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা। ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকা, আর জানুয়ারিতে দাম বেড়ে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের মধ্যে নভেম্বরে প্রতিলিটার বিক্রি হয়েছে ১৬৮ টাকা, ডিসেম্বর ১৭০ টাকা ও জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৭২-১৭৩ টাকা। এছাড়া পাম সুপার প্রতিলিটার নভেম্বরে বিক্রি হয়েছে ১৩৫ টাকা, ডিসেম্বরে লিটারে ৫ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়। আর জানুয়ারিতে আরেক ধাপ বেড়ে ১৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতিকেজি তিউনিসিয়া খেজুর নভেম্বরে ৩০০ টাকা বিক্রি হলেও ডিসেম্বরে বিক্রি হয় ৪০০ টাকা। আর সেই একই খেজুর জানুয়ারিতে বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা কেজি। তবে নভেম্বরে প্রতিকেজি পেঁয়াজ ১৩০ টাকা বিক্রি হলেও ডিসেম্বরে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হয়। তবে দেশিজাত বাজারে আসায় দাম কিছুটা কমে ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা শুধু মুখে বললে হবে না। এর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আগে সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষের হাতে নিত্যপণ্য দিতে হবে। পণ্যের দামে লাগাম টানতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেগুলো ঠিকমতো নেওয়া হচ্ছে না। তিনি জানান, বর্তমানে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষ যে খুব কষ্টে আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি কষ্টে রয়েছে। তাই বাজার ব্যবস্থাপনা ঠেলে সাজিয়ে পণ্যমূল্য সহনীয় করতে হবে।

এদিকে গত বছর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ৫৯৫ টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে। ফলে ভোক্তা অধিদপ্তর থেকেও মাংসের দাম সহনীয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে কম দামে পাওয়ায় অনেক নিু আয়ের মানুষ মাংস কিনতে পারে। কিন্তু ফের কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে গরুর মাংস। শুক্রবার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিকেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৭৫০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ৬০০-৬৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে গরুর কলিজা ৬৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও শুক্রবার বিক্রি হচ্ছে ৭২০ টাকা। এছাড়া প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০ টাকা। প্রতিকেজি লেয়ার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকা।

এছাড়া সবজির ভরা মৌসুমেও মাঝারি আকারের প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা। করলা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা। প্রতিকেজি কাঁচা মরিচ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি ধুন্দলের দাম ১০ টাকা বেড়ে ৮০-৯০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আলুর কেজি ৬০-৭০ টাকা, প্রতি কেজি বেগুন ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বড় আকারের প্রতিপিস লাউ ১০০ টাকার বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে টমেটোর কেজি রাখা হচ্ছে ৬০-৯০ টাকা। শিম কিনতে ক্রেতার কেজিপ্রতি খরচ হচ্ছে ৭০-৯০ টাকা। আর শিমের বিচি বিক্রি হচ্ছে কেজি ২০০ টাকা।

সম্প্রতি রোজানির্ভর পণ্যের এলসি খুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ঋণ যেমন সরবরাহ ঋণ বা সায়াপ্লায়ার্স ক্রেডিট, ট্রেড ক্রেডিট বা বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় রোজানির্ভর পণ্য আমদানির এলসি খোলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় দিয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে এসব পণ্য আমদানিতে ঋণনির্ভর এলসি খোলা যাবে। এছাড়া যেসব নিত্য বা রোজানির্ভর পণ্য ইতোমধ্যে আমদানি হয়েছে বা এলসির দায় পরিশোধের সময় এসেছে সেগুলোর দেনা ব্যাংক বা উদ্যোক্তারা পরিশোধের জন্য ডলারের সংস্থান করতে না পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে জোগান দিচ্ছে।

শুক্রবার সকালে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায় নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেছেন, আসন্ন রমজান মাসের আগে সব নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। রমযান উপলক্ষ্যে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য মজুত আছে। ভারত দীর্ঘদিন রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছিল। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। রমজান মাসের আগেই ভারত বাংলাদেশে চিনি ও পেঁয়াজ রপ্তানি করবে। আগে শুল্ক বেশি ছিল এখন সেটা কমিয়ে আনা হবে। এছাড়াও ব্রাজিল ও বিভিন্ন দেশ থেকে চিনিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য সামগ্রী আমদানি করা হবে। টিসিবির মাধ্যমেও রোজায় সারা দেশে খাদ্যপণ্য বিতরণ করা হবে।

 


মন্তব্য