‘ঈদ উৎসব’ করতে তৈরি মসলা সিন্ডিকেট

কোরবানি
  © ফাইল ফটো

তিন সপ্তাহ পর ঈদুল আজহা অর্থাৎ কোরবানির ঈদ। এ ঈদে মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, বছরের অন্য সময়ের তুলনায়। বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে প্রতিবছর এ সময়ে মসলার দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। জিরা, দারুচিনি, ধনিয়া, শুকনা মরিচ, লবঙ্গ ও হলুদের দাম গত মাসের তুলনায় বাড়তি। এলাচির দামও দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাদের অজুহাতে এবার হাওয়া জোগাচ্ছে ডলারের বাড়তি দাম। রাজধানীর পাইকারি বাজার মৌলভীবাজারে সরেজমিন ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

মসলা ব্যবসায়ী রফিক বেপারী বলেন, ‘ডলারের দাম বাড়ার কারণে আমদানি করা সব রকমের মসলার দাম বেড়ে গেছে। সামনে ঈদ আসতেছে, বর্তমানের চেয়ে আরো বেশি দাম থাকবে তখন।’

মৌলভীবাজারের মসলা বিক্রেতা আব্দুর রহমান বলেন, ‘এক মাসের ব্যবধানে এলাচির দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এক মাস আগে কেজিপ্রতি এলাচির দাম ছিল ২২০০ থেকে ২৪০০ টাকা। এখন তা হয়ে গেছে ৪২০০ টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে ৬০ শতাংশের বেশি দাম বেড়েছে এলাচির। জিরার দাম কিছু দিন পরপর কমে-বাড়ে। ছয় মাস আগেও জিরার দাম প্রতি কেজি জিরার দাম এক হাজার টাকার বেশি ছিল। সেখান থেকে কিছুটা কমে পাইকারিতে ৭২০ টাকা, খুচরায় ৮২০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে এখন। তবে এক বছর আগেও প্রতি কেজি জিরার দাম ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেই দামে জিরা বিক্রি করার মতো অবস্থা এখনো হয়নি।

মসলা বিক্রেতাদের দাবি, দেশে উৎপাদিত হলেও হলুদ ও শুকনা মরিচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি হয়। এ দুটি পণ্যের দামও গত বছরের তুলনায় বেশি। তবে দেশে উৎপাদিত পণ্য দুটির বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর বলা যাবে না।

মৌলভীবাজারে প্রতি কেজি জিরা ৬৩০ থেকে ৭২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা ১৫ দিন আগেও ছিল ৫৮০ থেকে ৬২০ টাকা। এলাচ প্রতি কেজি তিন হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা, যা রোজার আগে ছিল দুই হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা কেজি। দারুচিনি ১০ কেজির কাটন চার হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার ৮০০ টাকা। এই হিসাবে প্রতি কেজি দারুচিনি ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা। গত কয়েকমাস ধরে এই দাম চলছে। দুই মাস আগে প্রতি কেজি গোলমরিচের দাম ছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৬০ থেকে ৮২০ টাকা কেজি। লবঙ্গ প্রতি কেজি এক হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে কমে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এটার দাম কমেছে।

এছাড়া শুকনা মরিচ প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা। এক মাস আগে যেটা কেজিতে ২০ টাকা করে কম ছিল। আস্তো হলুদ প্রতি কেজি ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা দুই মাস আগে ছিল ২২০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি। ধনিয়া প্রতি কেজি ২৪০ টাকা থেকে কমে ১৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি আদা ২১০ থেকে ২৮০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগেও ছিল ১৬৫ থেকে ১৮০ টাকা। রসুন প্রতিকেজি ১৬০ থেকে ১৮২ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি। পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৪ থেকে ৭০ টাকা কেজি।

এদিকে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি জিরা ৮০০ টাকা, এলাচ তিন হাজার ২০০ থেকে চার হাজার ২০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, গোলমরিচ ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, শুকনা মরিচ ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা, আস্তো হলুদ ৩০০ থেকে ৩৮০ টাকা, ধনিয়া ২৪০ টাকা, আদা ২২০ থেকে ২৪০ টাকা, রসুন ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা ও পেঁয়াজ ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে রামপুরা বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী মল্লিক ট্রেডার্সের মালিক সবুজ মল্লিক বলেন, হঠাৎ করে বেড়ে গেছে ডলারের দাম। তাই মসলার দামও বেড়ে গেছে। আবার বিক্রি বেশি থাকলেও মসলার দাম বেড়ে যায়। এ পদ্ধতিতেই চলছে মসলার বাজার। আমরা পাইকারি দোকান থেকে চড়া দামে কিনে আবার চড়া দামে বিক্রি করতে হয়। আমরা খুচরা ব্যবসায়ীরা লাভ খুব কম করি। দাম বাড়ায় বেচাবিক্রিও অনেক কমে গেছে।’

মৌলভীবাজারের ঢাকা মসলা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী লাল মিয়া বলেন, ‘কোরবানির ঈদ কাছাকাছি। মসলার চাহিদা বাড়তেছে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা মসলা কম আমদানি করছে। আবার সহজে পাওয়া যাচ্ছে না এলাসি। আমাদের দেশ মসলা আমদানি নির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশের বাইরে মসলার দাম বাড়লে আমাদের দেশেও মসলার দাম বেড়ে যায়। বর্তমানে প্রায় সব ধরনের মসলা আমদানিতে খরচ বেশি পড়ে। তাই দাম বেড়েছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মসলা কম আমদানি হবে।’

আরেক মসলা বিক্রেতা মনির মালত  বলেন, ‘সত্যি বলতে কি, কয়েকটি সিন্ডিকেট ঈদের তিন মাস আগে মসলার দাম বাড়িয়ে ফেলে। পরে ঈদের কিছুদিন আগে সামান্য কিছু দাম কমিয়ে সরকারের কাছে প্রশংসিত হন। মসলার দাম কিছুটা কমিয়ে বলবে, মসলার দাম কমে গেছে। কিন্তু তাদের সময়মতো তারা মসলার দাম বাড়িয়ে তাদের ব্যবসা বুঝে নেয়।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকা অনুযায়ী, ছোট আকারের এলাচির খুচরা দাম কেজি প্রতি তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৮০০ টাকা। এক বছর আগে (গত কোরবানির ঈদ বাজারে) ছিল এক হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাজারে এলাচির দাম বেড়েছে ৬২ শতাংশ। বাজারে বড় আকারের এলাচির দাম আরেকটু বেশি। খুচরা বাজারে বড় আকারের প্রতি কেজি এলাচি সর্বোচ্চ চার হাজার ২০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে।

অন্য মসলার মধ্যে টিসিবির তালিকা অনুযায়ী, বাজারে প্রতি কেজি দারুচিনির দাম এখন ৫০০ থেকে ৫৮০ টাকা, এক বছর আগে যা ছিল ৪৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৫২০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১১ শতাংশ। বর্তমানে লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি এক হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। গত বছরের এ সময়ে ছিল ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে লবঙ্গের দাম বেড়েছে ১৭ শতাংশ। বাজারে ধনিয়ার কেজি এখন ২০০ থেকে ২৪০ টাকা। এক বছর আগে ছিল ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা। সেই হিসেবে ধনিয়ার দাম এক বছরে বেড়েছে ৫২ শতাংশ।

প্রতিকেজি তেজপাতার দাম এখন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। গত বছরের তুলনায় যা ২৫ শতাংশ বেশি। প্রতিকেজি জিরার দাম এখন বাজারে সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকা। গত বছরে একই সময়ে যা ছিল সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা। বাজারে প্রতিকেজি আমদানি করা শুকনা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৪৪০ থেকে ৫০০ টাকায়। গত বছর এ সময়ে দাম ছিল ৪২০ থেকে ৪৬০ টাকা। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে শুকনা মরিচের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। আর আমদানি করা হলুদের দাম গত বছর ছিল প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ১৩০ টাকা। এবার তা বেড়ে হয়েছে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।


মন্তব্য