বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

গত ৫০ বছরে পাচার হয়েছে ১১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা

অর্থ পাচার
  © ফাইল ছবি

দেশ থেকে দেশের বাইরে অবৈধভাবে অর্থ-সম্পদ চলে যাওয়াকে অর্থনীতির ভাষায় পুঁজি বা অর্থ পাচার বলা হয়। যতই দিন যাচ্ছে ততই বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সত্তরের দশক থেকেই বড় বড় আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন উপায়ে কোটি কোটি টাকা পাচার করে। আবার বিদেশিরাও বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বিদেশিরা যে পরিমাণ অর্থপাচার করছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থপাচার করছে বাংলাদেশিরা। 

বাংলাদেশে বিদেশিদের নিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অধিকাংশ বিদেশি টাকা পাচার করলেও বাংলাদেশিরা পরিকল্পনা করে অর্থপাচার করছে। বাংলাদেশের নাগরিকরা দুটি কারণে অর্থপাচার করছে। প্রথমত, যারা আপ্রর্দশিত আয় বা কালোটাকা দেশে ভোগ করতে পারছে না, তারা বিভিন্ন দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোমও গড়ে তুলছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেও বাংলাদেশিরা টাকা পাচার করছে। আর এই দুটো সেক্টরেই ব্যাপকভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কালোটাকার পাচার হচ্ছে।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৯২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। 

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি (ছবি সংগৃহীত)

আজ সোমবার (০৩ জুন) রাজধানীর ইস্কাটনের কার্যালয়ে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বিকল্প বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আইনুল ইসলাম এ তথ্য তুলে ধরেন।

আইনুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৭২-৭৩ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট অর্থপাচার হয়েছে আনুমানিক ১১ লাখ ৯২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশে মোট কালোটাকার আনুমানিক পরিমাণ হবে ১ কোটি ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।’ 

সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, সমিতি নতুন অর্থবছরে পাচার হওয়া অর্থের শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ উদ্ধারের সুপারিশ করেছে। এতে ৫ হাজার কোটি টাকা অর্থ উদ্ধার হবে। একইভাবে মোট কালোটাকার মাত্র শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ উদ্ধারের সুপারিশ করেছি। যেখান থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা উদ্ধার হবে। 

অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন সমিতির সভাপতি অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ। উপস্থিত ছিলেন সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ। 

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. খলীকুজ্জামান বলেন, ‘এখানে দুষ্টচক্র আছে। দুষ্টচক্র পেঁয়াজের বাজারে, আলুর বাজারে, ডলারের বাজারে, শ্রমের বাজারেও আছে। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে গড়তে চাই, তাহলে এই দুষ্টচক্র দমন করতে হবে। তা না হলে সরকার যেটা চাচ্ছে, সেটা হবে না।’

কালো টাকা কোথায় রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থনীতি সমিতির বিদায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, ‘কালোটাকা দেশের মধ্যে, সিন্দুকে, সোনাদানায়, জমিজমার মধ্যে আছে। বাড়ি কিনেছেন ৫ কোটি টাকা দিয়ে আর রেজিস্ট্রেশন করেছেন ৫০ লাখ টাকা দিয়ে। কারণ, ট্যাক্সফাইল পারমিট করে না। তাহলে এই সাড়ে ৪ কোটি কোথায় আছে? এটা এরকম বহু জায়গায় আছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘এই বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে দুইজন মানুষ। কিন্তু এখানে ৪৬টি গোষ্ঠী জড়িত। রড-সিমেন্ট থেকে শুরু করে বালি পর্যন্ত সবাই জড়িত।’ 

বারকাত বলেন, ‘অর্থমন্ত্রণালয় বছর দশেক আগে একটা জরিপ করেছিল বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ নিয়ে। সেটা প্রকাশিত হয়নি। সেখানে বলা হয়েছিল, বছরে যে পরিমাণ কালোটাকা তৈরি হয়, সেটা জিডিপির ৩৩ থেকে ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।’ 

অর্থপাচার রোধে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার দরকার। অর্থনীতিকে পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদেরা। উনারা সঠিক লাইনে যদি ব্যবস্থা নেন, তাহলে পদ্ধতি আছে। ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা চালু করলে এসমস্ত লোকে টাকাপয়সা যখন উঠাবে, বিদেশে টাকা পয়সা কাকে দিচ্ছে, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিয়ারেন্স বিভাগ থেকে ধরা যায়।


মন্তব্য