ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা

চট্টগ্রাম
  © ফাইল ছবি

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় পুলিশের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশু-কিশোররাও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ছোটখাটো অপরাধ করে পার পাওয়ার পর তারা একসময় বড় অপরাধী হয়ে উঠছে। তখন তাদের বাগে আনা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় শিশু-কিশোররা কেন অপরাধে জড়াচ্ছে তা খুঁজতে গিয়ে ভয়াবহ এক চিত্র বের করে এনেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বিশেষ শাখা। 

অপরাধীর আগের রেকর্ড ও বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিসংক্রান্ত জরিপ চালিয়ে তারা জানতে পেরেছে, স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের বড় একটি অংশ নানা অজুহাতে ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছে। উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা না থাকায় তারা ক্লাসের বাইরে সময় কাটাতে গিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে। কথিত রাজনৈতিক নেতা ও গডফাদারদের সংস্পর্শে হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। আর এভাবেই দেশে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা ও অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। 

এর থেকে উত্তরণে সিএমপি বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে প্রধান সুপারিশ হচ্ছে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে ৭০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা। উপস্থিতি না থাকলে তাদের নির্বাচনি ও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া। এজন্য প্রয়োজনে আইন পাশ করার কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটি পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার স্পিনা রানি প্রামাণিক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্লাসে উপস্থিত না থাকায় অন্তত ৯ ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়ছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে সহপাঠীর ওপর প্রাধান্য বিস্তার করছে। সহপাঠীকে শায়েস্তা করতে অপরজনও কোনো না কোনো কিশোর গ্যাং অথবা কথিত রাজনৈতিক বড়ভাইয়ের ছত্রছায়ায় যাচ্ছে। ক্লাস চলাকালে শহরের বিভিন্ন পার্ক, রেস্টুরেন্ট, বিনোদন স্পট, ডার্ক রেস্টুরেন্ট, মার্কেট ও সিনেমা হলে তাদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। স্কুলের খেলাধুলা, চিত্রাংকন, আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানে তারা আগ্রহ হারাচ্ছে। এতে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের একটি অংশ সাইবার জগতে সময় দিচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক ভিডিও গেমসের নেশায় বুঁদ হচ্ছে। হরর মুভি জুয়ার নেশা পেয়ে বসছে। জন্মদিন, ভ্যালেন্টাইনস ডেসহ বিভিন্ন উপলক্ষ্য সামনে রেখে রেস্টুরেন্ট পার্কে সময় কাটাচ্ছে। এসব উদযাপন করার নামে বিকৃত সংস্কৃতি চর্চায় জড়িয়ে পড়ছে। সিগারেট-মাদকের পয়সা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই এমনকি ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে সিএমপি কমিশনার পদ রায় বলেন, আমরা মনে করছি অপরাধী হয়ে ওঠার আগেই যদি তাদের থামানো যায়, অর্থাৎ ক্লাসে উপস্থিতির একটা মিনিমাম হার নির্ধারণ করে দেওয়া যায় তবে ঝুঁকিটা কমবে। এ দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাবোর্ডকে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। আইন করে যদি অন্তত ৭০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয় তবে অপরাধ কমবে। রাষ্ট্র উপকৃত হবে।

প্রতিবেদনে ভারতের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভারতে শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ৭৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।সিএমপি চট্টগ্রাম শহরের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জরিপ চালিয়ে নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বের করেছে। এই চিত্র ছিল বেশ হতাশাজনক। জরিপে দেখা যাচ্ছে, সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার মাত্র ২১ শতাংশ। এই কলেজে শ্রেণিকক্ষে ৩৮৯ জনের মধ্যে ৭০ শতাংশের উপরে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র ৮১ জন। ৫০ শতাংশের উপরে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫৫। গুল-এ-জার বেগম সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ১১৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭০ শতাংশের উপরে উপস্থিত আছে মাত্র ৩৩ জন। ৫০ শতাংশের কম উপস্থিত আছে ৬২ জন। কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপস্থিতির হার বিজ্ঞান বিভাগের ২৭৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭০ শতাংশের উপরে উপস্থিত ৩৫ জন। ৫০ শতাংশের কম উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৭।

সিএমপি বলছে, এ ধরনের বেশ কিছু অপরাধীর সঙ্গে কথা বলে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অপরাধী হয়ে ওঠার চিত্র পাওয়া গেছে। এ অংশটি মাঝপথেই শিক্ষার মূল স্রোত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া বা অপরাধপ্রবণতা থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে শ্রেণিকক্ষে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্লাসে ৭০ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেছিল। প্রজ্ঞাপনে নির্বাচনি বা প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও উপস্থিতি বিবেচনায় কৃতকার্য করারও বিধান রাখা হয়। কিন্তু পরে এ আদেশটি অজ্ঞাত কারণে বাতিল করা হয়।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নারায়ণচন্দ্র নাথ বলেন, আমরাও মনে করি স্কুল-কলেজে একটি নির্দিষ্ট হারে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। কোচিং ও প্রাইভেট নির্ভরতাও কমবে। অপরাধে জড়ানোর সুযোগ থাকবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি এ ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে অবশ্যই শিক্ষাবোর্ড তা বাস্তবায়ন করবে।


মন্তব্য