আরও দুটি জান্তা ঘাঁটি দখল বিদ্রোহীদের, পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে জান্তা সরকার

মিয়ানমারে
  © ফাইল ছবি

মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যে একদিনে দেশটির সামরিক বাহিনীর আরও দুটি ঘাঁটি দখল করেছে বিদ্রোহীরা। গেলো সপ্তাহে রাজ্যটির পাকান্ত এবং মানসি শহরের দুটি ঘাঁটি দখলে নেয় কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি (কেআইএ) ও কাচিন পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (কেপিডিএফ)।

বিদ্রোহী গোষ্ঠী দুটির সদস্যরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাদের বরাত দিয়ে ‍সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদ সংস্থা মিয়ানমার নাউ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় কেআইএ এবং কেপিডিএফ মিয়ানমার সেনাবহিনীর  নামতিন ঘাঁটি ঘেরাও করে হামলা চালায়। ঘাঁটিটি রাজ্যের রাজধানী মাইতকিনা শহরের সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তার ১৪ মাইল পূর্বে পাকান্তে অবস্থিত।
 
কেপিডিএফের এক কর্মকর্তা বলেন, টানা চার ঘণ্টা যুদ্ধ করার পর জান্তা সেনারা সেখন থেকে পালিয়ে যায়।
পাকান্ত ক্যাম্পের পাশাপাশি ওইদিনই মানসি টাউনশিপের আরেকটি সেনাঘাঁটিও দখল করেছে কেআইএ ওকেপিডিএফ।
 
এর আগে, এক প্রাতিবেদনে দ্য ইরাবতি জানায়, মিয়ানমারজুড়ে হামলা জোরদার করেছে দেশটির জাতিগত বিদ্রোহীরা। এতে গত তিনদিনে পিডিএফ ও এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশনসের (ইএও) হামলায় ৬২ সেনা নিহত হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু সামরিক ঘাঁটিও দখল করেছে বিদ্রোহীরা।
 
গত ১৩ নভেম্বর রাখাইনে অপারেশন-১০২৭ আবারও শুরু করার পর থেকে আরাকান আর্মি ১৬০টিরও বেশি জান্তা ঘাঁটি দখল করেছে, যার মধ্যে সিত্তওয়ের কাছে পাউকতাও শহর এবং চিন রাজ্যের পালেতওয়া টাউনশিপও রয়েছে।
 
সবশেষ  জান্তা সরকার এবার মিয়ানমারে চলতি সপ্তাহে তিন বছর পূর্ণ করলো। তবে এ মুহূর্তে তারা সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে। গণতন্ত্রপন্থি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো একের পর এক অঞ্চল দখল করে ক্রমেই রাজধানীর দিকে এগুচ্ছে। এতে, যেকোনো সময় পতন হতে পারে সেনাশাসনের।

গত অক্টোবরে জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে সামরিক টহল চৌকি, অস্ত্রাগার ও বেশ কিছু শহরের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিদ্রোহীদের হাতে।

বিদ্রোহীদের শক্তি কতটা?
ভয়েস অব আমেরিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের বিরোধী সশস্ত্র দলে জাতিগত ২০টি গোষ্ঠীর ১ লাখ ৩৫ হাজার সদস্য, ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট-এনইউজি-এর আওতায় পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের ৬৫ হাজার সদস্য, এবং সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্ট মুভমেন্ট-এর অধীনে প্রায় ২ লাখের মতো কর্মী রয়েছে।

এনইউজি-র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক উপমন্ত্রী ডেভিড গাম অং এর আগে ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, ‘স্বায়ত্ব শাসনের জন্য লড়ছে এমন কয়েকটি জাতিগত গোষ্ঠীর সাথে ২০২২ সালে জোট গঠন করেছে এনইউজি। এদের এর প্রায় ২ লাখ সেনার একটি বাহিনী রয়েছে যা আরও বাড়তে থাকবে। এটি জেনারেল মিন অং লাইংয়ের বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট।’

অন্যদিকে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে প্রায় ৪ লাখ সেনা রয়েছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট ফর পিস-এর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে প্রায় দেড় লাখের মতো সেনা রয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বা ‘কমব্যাট রেডি' ৭০ হাজার সেনাও অন্তর্ভুক্ত।

মিয়ানমারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের একটি দল যারা ‘স্পেশাল অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল ফর মিয়ানমার' নামে পরিচিত, তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জান্তা সরকারের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ ভূখণ্ডের ওপর, ২৩ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের দখলে রয়েছে ৫২ শতাংশের মতো ভূখণ্ড। তবে এ তথ্য নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিবিসির বার্মিজ সার্ভিসের সহকারী সম্পাদক আয় থু সান জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে তিনটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জোট থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের আলোচিত ‘অপারেশন ১০২৭' শুরুর পর থেকে এখনো পর্যন্ত তারা দেশটির ৩০টি শহরের দখল নিয়েছে।

আর সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গত তিন বছরে দেশের অনেক স্থানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। বর্তমানে সামরিক বাহিনী এমন সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছে যা এর আগে মিয়ানমারের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি।

সামরিক বাহিনীর মধ্যেও নজিরবিহীন আত্মসমর্পণের ঘটনা দেখা গেছে। সামরিক বাহিনীর নেতারা সামরিক পরাজয় মানতে বাধ্য হয়েছেন।

মিয়ানমারের থিংকট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি' বা আইএসপি-র চালানো জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট ভূখণ্ডের ৩৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে সামরিক কাউন্সিল।

এখন কেন শক্তিশালী বিদ্রোহীরা?
যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিস তাদের মূল্যায়নে বলছে, মিয়ানমারে বর্তমানে কর্তৃত্ববাদ বিরোধী যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে তা এখনো পর্যন্ত সফল বলেই মনে হচ্ছে।

দেশটিতে এর আগের গণতন্ত্র-পন্থী আন্দোলনের তুলনায় বর্তমানে চলমান প্রতিরোধ আন্দোলন জাতীয় অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে এবং এটি বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে যারা জান্তা সরকারকে উৎখাতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি।

প্রতিরোধ আন্দোলন সফল করার জন্য এটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং কাঠামোগত বাধা ও তেমন কোনো আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সংস্থাটি বলছে, টানা দুই বছর ধরে ছোট ছোট সফলতা পাওয়ার পর এই আন্দোলন ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে সুসংগঠিতভাবে দেশজুড়ে সামরিক অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে, যা এখন আসলেই জান্তা সরকারের শাসনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

গত অক্টোবর থেকে এখনো পর্যন্ত সাড়ে ৫ হাজারের বেশি জান্তা সেনা নিহত হয়েছে বা আটক হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রয়েছেন। প্রতিরোধ বাহিনী ৩০টির বেশি শহর দখলে নিয়েছে।

সব মিলিয়ে অভ্যুত্থানের পর থেকে এখনো পর্যন্ত জান্তা সরকার ৩০ হাজারের মতো সেনা হারিয়েছে। যেখানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে সেনার সংখ্যা মাত্র দেড় লাখ।

সামরিক বাহিনী প্রতিদিনই পরাজয়ের মুখে পড়ছে এবং তারা দখল হয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেও ব্যর্থ হচ্ছে। এমন অবস্থায় সামরিক বাহিনী দ্রুত জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারাচ্ছে।

বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জনগণকে আরও বেশি উস্কে দেওয়া ছাড়া কোনো কাজে আসছে না।

অলটারনেটিভ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন বার্মা নামে একটি সংস্থার সমন্বয়ক ডেবি স্টথার্ড বলেন, ২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের সময়ও দেশটির অনেক অঞ্চল বিদ্রোহীদের দখলে ছিল। যাদেরকে বলা হতো জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী।

তিনি জানিয়েছেন,‘এদের সাথে পরে পিপলস ডিফেন্স ফোর্স, যারা মূলত নতুন গঠিত শহরভিত্তিক গোষ্ঠী যারা জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিতে প্রস্তুত ছিল, তারাও যোগ দেয়। কারণ বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে জান্তা সরকারের অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল।’
 


মন্তব্য