ইসরায়েলি সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া সেই শিশুর মরদেহ উদ্ধার

গাজা
  © সংগৃহীত

গাজা সিটির দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি শহর থেকে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে তার স্বজনরা। শিশুটি ১২ দিন আগে ইসরায়েলি হামলায় আটকা পড়ে গাজার উদ্ধারকারীদের কাছে সাহায্য পাঠাতে অনুরোধ করেছিল।

তেল এল-হাওয়া শহরে শনিবার ছয় বছর বয়সী হিন্দ রাজাবের পরিবারের পাঁচ সদস্য ও দুইজন উদ্ধারকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানায় ফিলিস্তিনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ওয়াফা।

জানুয়ারির শেষে হিন্দ রাজাব পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ গাজা থেকে পালিয়ে তেল এল-হাওয়া যাচ্ছিল। পথে তাদের গাড়িটি ইসরায়েলের ট্যাংকের মুখে পড়লে গাড়িতে আগুন ধরে যায়। ওই সময় হিন্দ গাড়িতে বসেই ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) জরুরি নম্বরে ফোন দিয়ে তাকে বাঁচাতে বলে।

মুঠোফোনের ওপর প্রান্ত থেকে ক্ষীণ হয়ে ভেসে আসছিল ছ'বছরের এক শিশুর কণ্ঠস্বর। গাজার ছোট্ট শিশুটি ফোনকলে বলছিল, 'ট্যাংকটি খুব কাছে, আমার দিকে সরে আসছে ধীরে ধীরে।'   

ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের জরুরি কল সেন্টারে বসে রানা নিজের কণ্ঠস্বরকে শান্ত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'খুব কাছে?'  

'খুব, খুব,' ছোট্ট কণ্ঠটি উত্তর দিল। সে আরও বললো, 'তুমি কি এসে আমাকে নিয়ে যাবে? আমার খুব ভয় করছে!' 

ছয় বছর বয়সী হিন্দ রজব গাজা শহরে যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে আটকা পড়েছিল। চাচার গাড়ির ভেতর আটকে থাকা রজব অনবরত  সাহায্য চাইছিল রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের কাছে। 

গত সোমবার (২৯ জানুয়ারি)  সকালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লোকজনকে শহরের পশ্চিমাঞ্চল খালি করে উপকূলীয় সড়ক ধরে দক্ষিণে সরে যেতে বলেছিল। খালি করার আদেশে সেদিন রজব তার চাচা, খালা এবং পাঁচ চাচাতো ভাইকে নিয়ে তাদের বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। 

রজবের মা উইসাম জানান, তাদের এলাকায় প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ হচ্ছিল।  তিনি বলেন,  'আমরা আতঙ্কিত ছিলাম, এবং আমরা পালাতে চেয়েছিলাম। বিমান হামলা থেকে বাঁচতে আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে যাচ্ছিলাম।' 

পরিবারটি শহরের পূর্ব দিকে আহলি হাসপাতালের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, এই আশায় যে এটি তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় হবে।

উইসাম এবং তার বড় সন্তান পায়ে হেঁটে আহলি হাসপাতালের দিকে হাঁটতে শুরু করে। আর রজব তার চাচার একটি কালো কিয়া পিকান্টো গাড়িতে করে রওনা দেয়। 

উইসাম বলেন, 'খুব ঠান্ডা এবং বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়া ছিল। এজন্য আমি রজবকে গাড়িতে ওঠতে বলি কারণ আমি চাইনি সে বৃষ্টিতে কষ্ট পাক।' 

গাড়িটি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই তারা ওই দিক থেকে গুলির শব্দ শুনতে পান। রজবের চাচার গাড়ি যখন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তারা অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলি ট্যাংকের মুখোমুখি হন। আশ্রয়ের খোঁজে নিকটবর্তী ফারেস পেট্রোল স্টেশনে গেলেও ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রসফায়ারের শিকার হন তারা। 

গাড়ির ভেতরে পরিবারের লোকজন তাদের আত্মীয়ের কাছে সাহায্য চাইতে থাকেন। তাদের একজন পশ্চিম তীরের ৮০ কিলোমিটার দূরে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের জরুরি সদর দফতরে যোগাযোগ করেন।

রামাল্লার রেড ক্রিসেন্ট কল-সেন্টারের অপারেটররা রজবের চাচার মোবাইল ফোন নম্বরে কল করলেও তার ১৫ বছর বয়সী মেয়ে লায়ান উত্তর দেয়।

ফোন কলে লায়ান রেড ক্রিসেন্টের কর্মীদের বলে যে, তার বাবা-মা এবং ভাইবোনরা সবাই নিহত হয়েছে এবং তাদের গাড়ির পাশে একটি ট্যাংক রয়েছে। তিনি বলেন, 'তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। 

রেড ক্রিসেন্টের দল পুনরায় ফোন করলে লায়ন আর জবাব দেয়নি। ফোন ধরে রজব। রজবের  কণ্ঠ শোনা না গেলেও রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা বুঝতে পারেন যে, সে জীবিত আছে। পরিবারের বাকি সদস্যরা মারা গেলেও রজব গোলাগুলির মধ্যে গাড়িতে আটকে ছিল। 

রেড ক্রিসেন্ট দল রজবকে গাড়ির সিটের নিচে লুকিয়ে থাকতে বলে যাতে তাকে কেউ দেখতে না পারে। অপারেটর রানা ফাকিহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। তাকে ধৈর্য রাখতে বলেন অ্যাম্বুলেন্স না আসা পর্যন্ত। এই সময়ে রেড ক্রিসেন্ট রজবের অবস্থানে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করছিল। 

রানা বলেন, 'সে ভয়ে কাঁপছিল এবং সাহায্যের জন্য আবেদন করছিল। সে আমাদের বলছিল তার পরিবারের সবাই মারা গেছে।' 

কিন্তু রানা তাদের 'ঘুমন্ত' বলে বর্ণনা করে বলেন, 'ওদের ঘুমাতে দাও, আমরা ওদের বিরক্ত করতে চাই না।' 

অবশেষে তিন ঘণ্টার যন্ত্রণার পর রজবকে উদ্ধারের জন্য অ্যাম্বুল্যান্স পাঠানো হয়। অপেক্ষার সময় তারা রজবের মা উইসামকে ফোন কলে যুক্ত করতে সক্ষম হন। উইসাম তার মেয়েকে কোরআন পড়ে এবং ফোনে একসাথে প্রার্থনা করে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, সাহায্য না আসা পর্যন্ত তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

সন্ধ্যার পরে অ্যাম্বুলেন্স ক্রু, ইউসুফ এবং আহমেদ, রেড ক্রিসেন্ট অপারেটরদের জানায়, তারা রজবের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে এবং শীঘ্রই ইসরায়েলি বাহিনী প্রবেশের জন্য তাদের চেক করবে। দুঃখের বিষয়, এটি প্যারামেডিকস এবং রজবের সাথে অপারেটরদের  শেষ যোগাযোগ ছিল।

রজবের দাদা বাহা হামাদা জানান, এর পরেও কিছুক্ষণ রজবের সাথে তার মায়ের ফোন কল স্থায়ী হয়েছিল। উইসাম সর্বশেষ গাড়ির দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন এবং রজব তাকে বলেছিল যে, সে দূরে অ্যাম্বুলেন্সটি দেখতে পাচ্ছে।

উইসাম বিবিসিকে তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'কোথায় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত? প্রেসিডেন্টরা তাদের চেয়ারে বসে আছেন কেন?'

তিনি আরও বলেন, 'প্রতিটি মুহূর্ত যন্ত্রণাদায়ক, আশা করি অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ যেন আমার মেয়ের খবর নিয়ে আসতে পারে।'

তবে রেড ক্রিসেন্টের দল বা রজবের পরিবারের কেউই সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। 

সেদিনের অভিযান এবং রজব সম্পর্কে  ইসরায়েলি  বাহিনীর কাছে  জানতে চাওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তারা জানায় তারা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। এবার ছোট্ট শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সূত্র: ওয়াফা, বিবিসি


মন্তব্য


সর্বশেষ সংবাদ