কাজের ফাঁকে ঘুমানোর কার্যকারিতা; কখন এবং কতক্ষণ ঘুমাবেন?

পাওয়ার ন্যাপ
  © ফাইল ছবি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনের বেলা অল্প সময়ের ঘুম একটি দৈনন্দিন রীতি হয়ে গেছে। স্প্যানিশরা প্রতিদিনই সিয়েস্তা (অল্প ঘুম) উপভোগ করে থাকেন। কিছু জাপানি শ্রমিক দুপুরের খাবারের পর ছোট্ট সময় ঘুমিয়ে থাকেন। একে হিরুন বা বিকেলের ঘুম বলা হয়। বিশ্বের প্রযুক্তিভিত্তিক শীর্ষ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান গুগল, স্যামসাং এবং ফেসবুক তাদের কার্যালয়ে ন্যাপ পডের ব্যবস্থা রেখেছে। এতে করে কর্মীরা কাজের ফাঁকে কিছুটা শুতে পারেন। পাওয়ার ন্যাপিং নামে পরিচিত এই প্রবণতাটি এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। 

দিনের বেলা এমন অল্প সময়ের ক্যাটন্যাপ কী আসলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, এটি কি আপনাকে সতেজ এবং উজ্জীবিত হতে সহায়ক হয়, নাকি আপনি এমন ঘুমের পর আরও বেশি ক্লান্ত বোধ করেন? এসব প্রশ্নের পাশাপাশি আমরা আরও খুঁজে নেবো ন্যাপের সময়কাল কতক্ষণ হওয়া উচিত? এবং দিনের মধ্যে পাওয়ার ন্যাপের সেরা সময় কোনটি।

কর্মময় জীবনে প্রতিনিয়ত ব্যস্ততায় কাজ করতে করতে অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেন। টানা কাজে ক্লান্তি হয়ে কেউ কেউ কড়া লিকারের চা বা গরম কফিতেও চুমুক দেন। কিন্তু এতে সজীবতা এবং প্রয়োজনীয় শক্তি ফিরে পেতে ব্যর্থ হন অনেকে।। এর থেকে বাঁচার সহজ উপায় হচ্ছে ন্যাপ কিংবা আরও সহজ করে বললে কাজের ফাঁকে অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নেয়া।

ক্লান্তি দূর করতে পাওয়ার ন্যাপের অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। দিনের বেলায় এক পশলা বৃষ্টির মতো অল্পসময়ের ঘুম বা নিদ্রা আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পারে হারানো উদ্যম, কর্মষ্পৃহা ও উদ্দীপনা। এই ঘুম আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করার মধ্যে দিয়ে পুনরায় উজ্জীবিত করতে সহায়তা করবে। আপনি অনুভব করবেন এক অভাবনীয় শক্তি ও মানসিক তৃপ্তি। 

পাওয়ার ন্যাপিং বা দুপুরের হালকা ঘুম হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং যারা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়। শরীরে  হরমোনের ভারসাম্য আসে এবং ডায়াবেটিস, পিসিওডি ও থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণ রাখতে টনিকের মতো কার্যকর। এটি হজমশক্তি বাড়ায়, অনিদ্রা থেকে মুক্তি দেয়। অসুস্থতা থেকে দ্রুত স্বাস্থ্য ফিরে পেতে সহায়ক হয়। এমনকি অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সহায়ক হয়। 

এসব স্বাস্থ্যগত উপকারিতার পাশপাশি সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায়। কাজের মাঝে ১০ থেকে ৩০ মিনিটের ছোট্ট ঘুম নিঃসন্দেহে আপনার উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেবে। পাশপাশি সচেতনতা বাড়াবে এবং যে কোনো কাজ দ্রুত শেষ করার সক্ষমতা বাড়াবে। মস্তিষ্কের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এ সময়টাতে মস্তিষ্ক খানিকটা বিশ্রাম বা বিরতি পায় এবং পরবর্তী কাজে মনোসংযোগ বাড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়। 

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের বেলায় অল্প করে ঘুমালে বা ন্যাপ মানুষের শেখার ক্যাপাসিটি (নতুন শেখার ক্ষমতা) ও স্মৃতিশক্তি অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। যেকোনো সৃজনশীল কাজের আগে পাওয়ার ন্যাপ দারুণ কাজ দেয়।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের বেলার স্বল্প এ ঘুম বা ন্যাপ মানুষের হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। যারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তারা তা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন ন্যাপের মাধ্যমে। একইভাবে আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, বিকেল বেলার একটি পাওয়ার ন্যাপ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হয়।

ন্যাপের উপযুক্ত সময়কাল কতক্ষণ আর সঠিক নিয়ম 
কর্মক্ষেত্রে সকাল থেকে টানা কাজে অনেকেরই কর্মস্পৃহায় ভাটা নামে। ঠিক দুপুরের খাবারের পর বেলা ২টা থেকে ৩টার মধ্যে ন্যাপ নিতে হবে। বাম দিকে কাত হওয়া অবস্থাতে ন্যাপ নিতে পারে। এভাবে ১০ থেকে ৩০ মিনিট ঘুমানো যেতে পারে। তবে খুব অল্প বয়স্ক, খুব বৃদ্ধ, খুব অসুস্থ হলে সেটা ৬০ থেকে ৯০ মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। ন্যাপের আদর্শ সময় হলো ২০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ৫০ মিনিট। তবে একটি বিষয় জেনে রাখা ভালো যে ন্যাপ কিন্তু দুই বা তিন ঘণ্টার নাক ডাকা ঘুম নয়, এমনকি এক ঘণ্টাও নয়। 

তবে, আপনি যদি কর্মস্থলে থাকেন তাহলে আপনার পক্ষে দুপুরে বিছানায় শুয়ে থাকা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে, আপনি  মাথা ডেস্কে রেখে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন। অথবা আপনি একটি ইজি চেয়ারে বসে থাকতে পারেন। যদি আপনি এটি না করতে পারেন তবে কোনো জানালার কাছে যান, অনেক দূরে তাকান এবং আপনার মনকে উন্মুক্ত করে দিতে পারেন।

তাই দুপুরে লাঞ্চের পর, বিশেষ করে ২টা থেকে ৩টার মধ্যে কিছুক্ষণ ন্যাপ নিলে কাজের স্পৃহা ফিরে আসে। এতে জটিল কাজ করা যায় সহজে। এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হতে পারে কর্মক্ষেত্রে সফলতা এবং পদোন্নতি। আর টানা অবসাদের কারণে প্রায়ই মেজাজ হারাতে পারেন। হয়ে উঠতে পারেন খিটখিটে, অধৈর্য, বিরক্তিকর। আর উপযুক্ত সময়ের ন্যাপিং আপনাকে ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব দিতে পারে, হয়ে উঠতে পারেন করপোরেট লিডার।

দীর্ঘ সময় ভ্রমণ শুরুর আগে কিছুটা সময় ন্যাপ নিয়ে নিতে পারেন। এর ফলে মানসিক শক্তি ফের ফিরে পাবেন এবং নতুন উদ্যমে ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন। পরীক্ষার আগে ন্যাপ ভালো ফলাফলে সহায়ক হতে পারে। সম্প্রতি বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষার আগ মুহূর্তে অতিরিক্ত পড়ার চাইতে সামান্য একটু ঘুম বা ন্যাপিং মস্তিষ্কের স্মরণশক্তিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। 

সূত্র : বিবিসি


মন্তব্য