শেষ মুহূর্তে হাজারো কর্মীর স্বপ্নভঙ্গের কান্না

মালয়েশিয়া
  © সংগৃহীত

নাটোরের সিংড়ার বাসিন্দা মো. সাইফুল্লাহ (২০)। কাজের জন্য মালয়েশিয়া যেতে গতকাল শুক্রবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তিনি। দেশটিতে যাওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জের গ্রিন লাইন এজেন্সিকে দিয়েছেন ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। ওই এজেন্সির মালিক মো. আবু গতকাল তাকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উড়োজাহাজের টিকিট দেওয়ার আশ্বাস দেন। তার কথামতো গতকাল ভোরে বিমানবন্দরে হাজির হন সাইফুল্লাহ। তারপর এজেন্সি মালিকের মোবাইল ফোনে কল করেন টিকিটের জন্য। তখন তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। এক ঘণ্টা পর ফের মো. আবুর মোবাইল ফোনে কল করলে তা বন্ধ পান। নিরুপায় সাইফুল্লাহ অসহায় অবস্থায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টার্মিনাল-১-এর সামনে বসে থাকেন।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জমি বন্ধক ও সুদে টাকা ধার করে ওই এজেন্সিকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। গত পাঁচ দিন ধরে টিকিট দেওয়ার নামে ওই এজেন্সির মো. আবু আমার সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। সবশেষ আজ (গতকাল) টিকিট কনফার্ম করার আশ্বাস দেন। কিন্তু বিমানবন্দর আসার পর থেকেই তার ফোন বন্ধ। তাই যোগাযোগ করতে পারছি না। আমার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। এই মুখ নিয়ে আমি কীভাবে বাড়িতে ফিরব। আজ মালয়েশিয়া যেতে না পারলে আত্মহত্যা করব। তবুও বিমানবন্দর ছাড়ব না।’

তার মতো ওই এজেন্সির প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন ২৪ জন মালয়েশিয়াগামী কর্মী। যাদের অধিকাংশরই বাড়ি নাটোর। প্রত্যেকে ওই এজেন্সিকে গড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দিয়েছেন। গতকাল তারা বিমানবন্দরে আসেন। কিন্তু দালাল ও এজেন্সি তাদের বিমানবন্দরে আসতে বলে লাপাত্তা। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের গ্রিন লাইন এজেন্সির মালিকের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে শুধু সাইফুল্লাহসহ নাটোরের এই ২৪ জনই নয়, মালয়েশিয়ায় কর্মী হতে ইচ্ছুক প্রায় ৩২ হাজার বাংলাদেশির স্বপ্ন ভঙ্গ হতে চলেছে। শেষ সম্বল এজেন্সির হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই। এক-দুজন নয়, গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরের সামনে বিমান টিকিটের জন্য ভিড় করেন মালয়েশিয়ায় কাজের জন্য যেতে ইচ্ছুক হাজার হাজার ব্যক্তি। তাদের কেউ আসেন সকালে, আবার কেউবা আগের দিন রাত থেকে করছিলেন অপেক্ষা। এজেন্সিগুলোর আশ্বাসে বসে বসে পার করেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নভাঙা মানুষগুলো চোখেমুখে বাড়তে থাকে হতাশার ছাপ। অনেক এজেন্সি লাপাত্তা মানুষগুলোর লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে।

শেষ মুহূর্তে শুধু টিকিটের জন্য দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করছেন অনেকে। জাল টিকিটের প্রতারণায়ও পড়েন কেউ কেউ। মালয়েশিয়া সরকার গতকালের পর আর কোনো কর্মী নেবে না এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের প্রায় ৩২ হাজার কর্মীর দেশটিতে যাত্রা আটকে গিয়েছে।

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কথা বিবেচনা করে ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গতকাল সন্ধ্যার পর ফ্লাইটটি ঢাকা ছেড়ে যায়। এ ফ্লাইটে ২৭১ জন যাত্রী মালয়েশিয়া গেছেন।

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২১ মে পর্যন্ত গত আড়াই বছরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৫ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৪ জন কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেয়। ২১ মের পর আর অনুমোদন দেওয়ার কথা না থাকলেও মন্ত্রণালয় আরও ১ হাজার ১১২ জন কর্মীকে দেশটিতে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। সব মিলে ৫ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৬ জন কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে যেতে পেরেছেন ৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৪৫ জন। আর এজেন্সির প্রতারণাসহ টিকিট জটিলতায় মালয়েশিয়া যেতে পারেননি অনুমোদন পাওয়া ৩১ হাজার ৭০১ জন কর্মী।

জনশক্তি রপ্তানির নিরিখে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। গত বছর সেখানে সাড়ে তিন লাখ শ্রমিক গিয়েছিল, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৪৪ হাজারের বেশি শ্রমিক গেছেন। দেশটিতে বাংলাদেশের রমরমা শ্রমবাজার হলেও দুর্নীতির কারণে ২০১৮ সালের পর ফের বন্ধ হল। মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকালের পর থেকে বাংলাদেশি কোনো কর্মীকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। এ শ্রমবাজার বন্ধের জন্য দুই দেশের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মালয়েশিয়ায় হাইকমিশনার হাসনা মোহাম্মদ হাসিম।

তিনি গত ২৯ মে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সিন্ডিকেট বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এটা ভাঙতে আমরা চেষ্টা করছি। এটা এখনো আমাদের (উভয় সরকারের) নিয়ন্ত্রণে নেই।’ ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ৩১ মে পর বিদেশি কর্মীদের প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

জানা গেছে, দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছিল। তখন ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির গড়ে তোলা চক্রের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হন লাখো শ্রমিক। চাকরির নিশ্চয়তা, আবাসন ও খাওয়ার ব্যবস্থার কথা বলে তারা হাতিয়ে নেয় কয়েক কোটি টাকা। বন্ধ হওয়া শ্রমবাজার আবার চালু করতে সময় লেগেছিল তিন বছর। ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা চুক্তির আওতায় ফের চালু হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। ২০২২ সালের আগস্টে ফের বাংলাদেশি কর্মীদের সেখানে যাওয়া শুরু হয়।

নতুন সমঝোতার পর ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট ভেঙে দায়িত্ব দেওয়া হয় ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সিকে। পরে শ্রমিক পাঠানোর অনুমতি পায় ১০০ এজেন্সি। তবু অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। নতুন সমঝোতার পর সে দেশে গিয়ে লাখো বাংলাদেশি কর্মী প্রতারিত হয়েছেন। মাসের পর মাস কাজ না পেয়ে এখনো বন্দিজীবন পার করছেন অনেকেই। এ সিন্ডিকেটের ফাঁদেই দুই বছর পাঁচ মাসের মাথাই বন্ধ হলো দেশটির শ্রমবাজার।


মন্তব্য