জিয়াউর রহমানও ২৫ মার্চ বাঙালির ওপর আক্রমণকারীদের একজন : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
  © ফাইল ছবি

স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস কথা বলতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ যে আক্রমণটা বাঙালির ওপর চালায়, সেই আক্রমণকারী একজন কিন্তু জিয়াউর রহমানও। সেটা হলো চট্টগ্রামে। এটাও ভুললে চলবে না।

আজ বুধবার (২৭ মার্চ) মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আজ স্বাধীনতার ৫৩ বছর আমরা পার করেছি। এই ৫৩ বছরের মধ্যে ২৯টা বছরই এ জাতির জন্য ছিল দুর্ভাগ্যের বছর।'

যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে  শেখ হাসিনা বলেন, 'আজকে যেমন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, কেউ বলছে গণতন্ত্রই নাকি নাই। কেউ বলছে বাংলাদেশের মানুষের নাকি কিছুই হয়নি, কোনো উন্নতিই হয়নি। যারা এসব কথা বলে যাচ্ছে, এ ধরনের কিছু কর্মকাণ্ড স্বাধীনতার পরপর আমরা দেখেছি।'

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, 'একটি সদ্য স্বাধীন দেশ, এই দেশটি ছিল পরাধীন। এ দেশের মানুষ ছিল শোষিত-বঞ্চিত। যেখানে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষই দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে। পরনে ছিন্ন কাপড়, পেটে ক্ষুধার জ্বালা, বাসস্থান নেই, চিকিৎসা নেই। সেই একটি জাতিকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে, মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় এনে দেওয়া; একমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের মতো বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিল বলেই সম্ভব।'

ভারতসহ সব মিত্র রাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, 'যে কোনো যুদ্ধে যে কোনো বিপ্লবে মিত্র শক্তির সহায়তা প্রয়োজন হয়। কাজেই আমরাও সেই সহায়তা পেয়েছিলাম। আবার পেয়েছি অনেক বড় বড় দেশের বৈরিতা, যারা পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী যখন আমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে, গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের সমর্থন দিয়েছিল, অস্ত্র দিয়েছিল, সাহায্য করেছিল। তবে সেসব দেশের নাগরিকদের সহায়তা, তাদের সমর্থন বাংলাদেশ পেয়েছে।

'আপনারা জানেন, আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর, যারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে, সমর্থন দিয়েছে, আমাদের শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা তাদের কিন্তু সম্মাননা দিয়েছি। আমরা বাঙালি, আমরা কৃতজ্ঞ জাতি। আমাদের যদি কেউ সহযোগিতা করে, আমরা তাদের প্রতি সম্মান দেখাতে জানি, আমরা সেটাই প্রমাণ করেছি। বোধ হয় বিশ্বে একমাত্র বাংলাদেশ এভাবে মিত্র শক্তিকে সব ধরনের সম্মান দিয়েছে। আমরা মনে করি, সম্মান দিয়ে আমরাই সম্মানিত হয়েছি,' যোগ করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, 'যুদ্ধের ক্ষেত্রে যে দলটি আজকে বড় বড় কথা বলে যাচ্ছে যে, ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সব নাকি পালিয়ে গেল, তাহলে এই সরকার গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করল, শুধু পরিচালনা না সেখানে যে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা হলো, বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশকে ভাগ করা হলো এবং একেকটা সেক্টরে যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, সেখানে যিনি দায়িত্বে ছিলেন, তিনি আহত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সেখানে দায়িত্ব পায়।'

তিনি বলেন, 'জিয়াউর রহমান তো সেখানে একটা বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বেতনভুক্ত কর্মচারী ছিল জিয়াউর রহমান এ কথা নিশ্চয়ই তাদের ভুলে গেলে চলবে না। এটাও ভুললে চলবে না যে, স্বাধীনতার পর; জিয়াউর রহমান ছিল একটা মেজর। জিয়াউর রহমানের জন্ম হলো কলকাতায়। তার পরিবার, যখন পাকিস্তান-হিন্দুস্তান হয়ে যায়, পাকিস্তানে যখন ফিরে আসে, সে কিন্তু এই পূর্ববঙ্গে আসেনি। তারা গিয়েছিল করাচিতে। জিয়াউর রহমান সেখানেই পড়াশোনা করে। সেখানেই আর্মিতে যোগ দেয়। সেখান থেকে কার্যাদেশ পেয়ে সে পূর্ববঙ্গে এসেছিল দায়িত্ব পালন করতে। সামরিক অফিসার হিসেবে সে এখানে দায়িত্ব পালন করতো কিন্তু তার মনে তো ওই পাকিস্তানটাই রয়ে গেছে। আর তার প্রমাণও আছে।

'সেই সময় জিয়াউর রহমান যে মেজর থেকে মেজর জেনারেলটা হলো, এ প্রমোশনগুলো একে একে কে দিয়েছে? এটাও তো আওয়ামী লীগ সরকার দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দিয়েছে। এই অকৃতজ্ঞরা সেটাও বোধ হয় ভুলে যায়,' বলেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'সেই দল ক্ষমতায় থাকলেই যে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয় তা তো আজ প্রমাণিত সত্য। যখন এই ক্ষমতা দখলকারীরা, অর্থাৎ রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষণা দিয়ে আমি রাষ্ট্রপতি হলাম। সেই হলাম পার্টি যখন ক্ষমতায় ছিল এ দেশের মানুষের ভাগ্যে কী ছিল? ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সেশন জট, এই তো অবস্থাটা ছিল। আজকে যারা প্রশ্ন করেন, আওয়ামী লীগ কোথায় ছিল? আমি জিজ্ঞেস করি, আপনারা কোথায় ছিলেন? সেটাও একটু বলেন। জবাব দেন।

'কোথায় ছিল তাও আমি বলি, ২৫ মার্চ পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যখন এখানে গণহত্যা শুরু করে, তারা কিন্তু চট্টগ্রামেও হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিল। যারা ব্যারিকেড দিচ্ছিল জাতির পিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে, তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। আর চট্টগ্রামে সেই সেনাবাহিনীর দায়িত্বে জিয়াউর রহমান ছিল এবং জিয়াউর রহমানও যারা সেই সময় ব্যারিকেড দিয়েছে তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে। শুধু তাই না, সোয়াত জাহাজ এসেছে পাকিস্তান থেকে অস্ত্র নিয়ে, সেই অস্ত্র খালাস করতে গিয়েছিল জিয়াউর রহমান। সেখানে এই যে সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও অন্যান্য সাধারণ জনগণ, তারা তাকে পথে আটকায়। তাকে যেতে দেয়নি, বাধা দিয়েছিল এবং সেখান থেকেই ধরে নিয়ে আসে। সেই সময় আমাদের নেতারা; এখন তো অনেকেই বেঁচে নেই! তারা এখনো সেটা স্মরণ করে,' বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, 'কাজেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ যে আক্রমণটা বাঙালির ওপর চালায়, সেই আক্রমণকারী একজন কিন্তু জিয়াউর রহমানও। সেটা হলো চট্টগ্রামে। এটাও ভুললে চলবে না।'

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'যখন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সর্বপ্রথম ২৬ মার্চ দুপুর ২টা-আড়াইটার সময় মান্নান সাহেব, চট্টগ্রামের সেক্রেটারি ঘোষণা দেওয়া শুরু করে। একে একে আমাদের যারা নেতা সবাই ঘোষণা পাঠ করে। সে সময় জহুর আহমেদ সাহেব বলেন, আমাদের একজন মিলিটারি লোক দরকার। তাহলে আমরা যে যুদ্ধ করছি, সেই যুদ্ধ যুদ্ধ হবে। তখন মেজর রফিককে বলা হয়, তিনি তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে আটকানোর জন্য অ্যাম্বুস করে বসে আছেন। বলছেন, আমি এখান থেকে নড়লে এই জায়গাটা ওরা দখল করে নেবে। ওই সময় জিয়াউর রহমানকে ধরে আনা হয় এবং তাকে দিয়ে ২৭ তারিখ সন্ধ্যার পরে সে জাতির পিতার পক্ষে ঘোষণাটা দেয়। পাঠ করে। কেউ যদি কিছু বলে, আমরা আওয়ামী লীগ তাকে খাটো করে দেখিনি। জিয়াউর রহমান একজন মেজর, সে যখন বলছে মানুষের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবটা আসবে, এই উদ্দেশ্য নিয়েই একজন সামরিক অফিসারকে দিয়ে এই ঘোষণা পাঠ করানো হয়েছিল। সেটাকেই এখন একেবারে ঘোষক হিসেবে; হ্যাঁ, রেডিওর ঘোষক, টেলিভিশনের ঘোষক, আমাদের এই মিটিংয়েরও তো ঘোষক আছে, তাই না? ঘোষক তো সেই ঘোষক। কাজেই এটা নিয়ে বড়াই করার তো কিছু নেই! তারা এটা (নিয়ে) বড়াই করে যাচ্ছে।'

শেখ হাসিনা প্রশ্ন রাখেন, 'যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফেলল, তার বউ ছেলেকে হেফাজতে রেখে দিলো পাকিস্তানিরা আর আসলাম বেগ চিঠিতে জানাল জিয়ার কার্যক্রমে তারা সন্তুষ্ট, কেন সন্তুষ্ট জানেন? যতগুলো সেক্টরে যুদ্ধ হয়েছে, আপনারা হিসাব করে দেখেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সব থেকে বেশি হত্যা করা হয়েছে যেটার দায়িত্বে ছিল জিয়াউর রহমান। সব থেকে বেশি হতাহত ছিল সেখানে।'


মন্তব্য