পুনশ্চঃ

পুনশ্চ
  © ফাইল ছবি

প্রায় তিরিশ বছর পরে আশরাফের সাথে যোগাযোগ, ফেসবুকের মাধ্যমে। তৃষা যখন স্কুলে পড়ে, তখন আশরাফরা ওদের পাশের বাসায় থাকতো। বিকালে এক সাথে ছাদে গল্প করতো, সাইকেল চালাতো। আশরাফ অনেক গল্প করতো ওর পরিবারের, কবিতা লিখতো। সব কিছুই তৃষাকে শেয়ার করতো। কিন্তু, তৃষা খুব একটা মনোযোগ দিয়ে শুনতো না। আশরাফ বেশ দুঃখ পেতো। এটা যে তৃষা বুঝতো না তা না। আশরাফের এক ভাই আমেরিকা থাকতেন, উনি সব কাগজপত্র ঠিক করে ওদেরকে আমেরিকায় নিয়ে যান। তারপর থেকে ওদের আর যোগাযোগ নাই। 

অনেক সময় পার হয়ে গেছে, জীবন থেমে থাকে না। তৃষার পড়ালেখা শেষ করে, বাবার পছন্দের ছেলে কে বিয়ে করে, সুখেই আছে। একটি মেয়ে, এখন, সে ও বড় হয়ে গেছে। এ লেভেল, শেষ করে বিলাতে পড়ছে, ‘ল’ তে। তৃষার স্বামীকে ব্যবসায়িক কাজে প্রায় ই বিদেশে যেতে হয়। কোন কোন সময় তৃষা কে ও সাথে নিয়ে যায়। কাজ আর ঘোরা দুটোই হবে। কারণ তৃষা খুব ঘুরতে পছন্দ করে। ওর স্বামী ওকে যথেষ্ট ভালোবাসে। ওর পছন্দের অপছন্দের মূল্য দেয়। তৃষা ও দেয়, কিন্তু কোথায় যেন একটা শূন্যতা আছে। তৃষা বুঝতে পারে না কেনো। এক বছর আগে, একদিন আশরাফ চৌধুরী নামে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে। তৃষা সহজে কাউকে ফ্রেন্ড করে না। কিন্তু নামটার জন্য, প্রোফাইলে ঢুকে, যেই ছবি টা প্রোফাইলে, সেটা দেখে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলো না। যার কথা চিন্তায় আসলো, সে কিনা। প্রোফাইল ঢুকে ঢুকে, তৃষা চমকে উঠলো, কিছু পুরনো ছবি দেখে। আরও বেশি অবাক হলো, এত বছর পরে তাঁকে খুঁজে, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর জন্য। 

তখনই রিকোয়েস্ট একসেপ্ট না করে, এক সপ্তাহ পরে করলো। সাথে সাথে উত্তর আসলো মেসেজে।
এত সময় লাগলো গ্রহণ করতে?

তৃষা হাসির ইমোজি দিয়ে লিখলো, তোমাকে কি ফোন করতে পারি? ওদিক থেকে উত্তর এলো ২৪/৭ 

পুনশ্চঃ !! এত বছর পরে যোগাযোগ হলো, দুজনের মধ্যেই অনেক উত্তেজনা, কৌতুহল, আবেগ। কেউ করো ব্যাপারে তেমন কিছু জানে না। যেহেতু তৃষার মেয়ে এখন দেশে নেই, স্বামীও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ওভাবে সময় দিতে পারে না। তৃষা এখন অনেক অবসর। বিয়ের পর থেকে বন্ধু বান্ধবীদের সাথে ও যোগাযোগ কমে গেছে, সংসার শ্বশুরবাড়ী নিয়েই কাটিয়েছে। তৃষার স্বামী বাড়ির বড় ছেলে, তাই বড় বউ হিসেবে সব সময়ই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। এখন অফুরন্ত সময় থাকলেও নতুন করে পুরনো বন্ধুদের আর খোঁজা হয়নি। 

ঠিক এমনই সময়, হঠাৎ করে আশরাফকে পেয়ে তৃষা বেশ খুশি। তার কোথা বলার একজন পাওয়া গেছে। আর নতুন কেউ না, পূর্ব পরিচিত। সুতরাং, সব কিছুই অবলীলায় বলতে পারে। দুজনেরই অনেক কিছু জানার আছে। এত বছরের জমানো গল্প। দুজন দু’দেশে থাকলেও, ঠিকই সময় বুঝে কথা বলে। 

এর মধ্যে ই তৃষা আশরাফের ভালো লাগা না লাগার বিষয় গুলো জেনে যায়। কথা প্রসঙ্গে আশরাফ বলে ; দেশে আসলে একবার ওরা ছোট বেলায় যেই পাড়ায় ছিলো সেখানে গিয়ে, ওই বাসাটা তার দেখার খুব ইচ্ছে।

তৃষা কে বলে, তুমি কি যাবে, আমার সাথে একদিন সময় করে ?

তৃষা হাসে, সেদিন কোন উত্তর দেয়নি। শুধু জিজ্ঞেস করে; তুমি কবে আসবে?

আশরাফ বলে; সামনের মাসে ওর অফিসের কাজে দশ দিনের জন্য আসতে হবে।

এত দিন তৃষারা নিজেদের ফ্লাটেই ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই ওর বাবা মারা যাওয়ায়, ওর মা একা হয়ে যান। তৃষার ভাই, বোনরা  বিদেশে থাকায়, ওদের ওর বাবার ফ্লাটে উঠে আসতে হয়। যদিও ওর স্বামীর খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। শেষমেশ রাজি হয়, কিন্তু একটা শর্ত যে একসাথে না, আলাদা ফ্লাটে থাকতে হবে। তৃষা তাতেই রাজি। অন্তত মাকে প্রতিদিন তো একবার দেখতে পারবে। এই ব্যাপারটা, এত কথার মাঝে আশরাফকে বলা হয়নি যে তৃষা এখন ওই পাড়াতেই, ওই বাসায় থাকে। এর মাঝে বেশ কিছুদিন দুজনেরই ব্যস্ততায় কথা হয়নি। এক মাস পরে আশরাফ অফিসের কাজে দেশে আসলো। প্রথম এক সপ্তাহ খুবই ব্যস্ত ছিল। একটু অবসর পেয়ে, তৃষা কে ফোন করে জানলো সে এখন দেশে, আর বললো, 

তোমাকে যে বলেছিলাম যাবে আমার সাথে ওখানে একদিন?

তৃষা এবারও নিশ্চুপ। আশরাফ বললো; কোন উত্তর নাই কেনো ? ভয় পেলে? 

তৃষার স্বামী তিন দিনের জন্য সিলেট ব্যবসায়িক কাজে যাবে। তৃষার ও যাবার যাওয়ার কথা। কিন্তু ওরা যেদিন ফিরবে, সেদিনই আশরাফের ফিরে যাবার ফ্লাইট। 

তৃষার কেনো যেনো আশরাফের মনের ইচ্ছেটা পূরণ করতে চাইলো। ওর সাথে আগের মতো মুখোমুখি বসে গল্প করতে ইচ্ছে হলো। যদিও তৃষার আগে কখনও এমন ব্যতিক্রমধর্মী কোন ইচ্ছে হয়নি। নিজেই খুব অবাক হলো। 

ওর এত ঘুরতে যেতে পছন্দ তারপর ও, তৃষা বলে বসলো ও এবার যাবে না। ওর পায়ে খুব ব্যথা। এত দূরে গাড়িতে বসে থাকতে কষ্ট হবে। কি আর করা, ওর স্বামী বললো, এত ব্যথা? একটা ভালো ডাক্তার দেখাও।

পরের দিন তৃষার স্বামী বের হবার পরই, আশরাফকে ফোন করে তৃষা বললো; সন্ধ্যায় চলে আসো, রাতে থাকবে, সারারাত গল্প করবো।

চরম অবিশ্বাস্য ভাবে আশরাফ জিজ্ঞেস করলো, কোথায়?

তৃষা বললো; কেনো আমাদের পুরনো পাড়ার আগের বাসায়।

আশরাফ আবারও বললো, এটা কিভাবে সম্ভব ? কেউ নাই তোমার বাসায়? 

এবার তৃষার পালা, ভয় পেলে? চিন্তা করো না, তোমাকে কখনও কোনও অসম্মান জনক পরিস্থিতিতে ফেলবো না। আমার উপর বিশ্বাস রেখো।

আশরাফ বললো, তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস ই করতে পারছি না, কী বলছো? সামাজিক ভাবে এটা কী সম্ভব? তুমি বিবাহিত, আমিও, সেখানে তোমার বাসায়, পুরনো প্রতিবেশী বন্ধু হিসেবে, বিকেলে এক কাপ চা খেতে যেতেই পারি। কিন্তু রাতে থাকা ? মাথা ঠিক আছে তো?
হুম, ঠিকই ধরেছো, একটু ছিট আছে। বোধ হয় মতিভ্রম ঘটেছে। বয়স হয়েছে তো। আসবে কি না বলো?

আশরাফের ও মনে মনে খুব ইচ্ছে ছিলো পুরনো পাড়ায় যাওয়ার, তৃষাকে ও একবার দেখার, সামনাসামনি বসে গল্প করার। শেষে রাজি হয়ে গেলো। 

কখন আসবো? 

আমি আম্মাকে রাত আটটার মধ্যে খাইয়ে চলে আসি। তাহলে তুমি আটটার পরে আসো।

আশরাফ বললো; জো হুকুম, পুরনো পড়াতো চিনি, কিন্তু এতো বছর পর, বাসার নাম্বার আর ফ্ল্যাট নাম্বারটা টেক্স করে দাও।

রাত ৮’২০ এ, মনের মধ্যে উত্তেজনা, সংশয়, দ্বিধা সব মিলিয়ে আশরাফ বাসার নিচে এসে, তৃষাকে আবার ফোন দিলো, 
কি এখনও বলো সত্যি আসবো?

তৃষা খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললো; হুম, চলে আসো।

যতই স্বাভাবিক থাকুক, কথায়, ব্যবহারে, মনের ভিতরে তৃষা চিন্তা করে, কিভাবে এরকম দুঃসাহস করলো সে? আশরাফ উপরে এসে কলিং বেল দিতেই তৃষা হাসি মুখে খুব স্বাভাবিক ভাবেই দরজা খুলে দিলো। আশরাফ ঢুকে জুতো খুলে মোজা পরেই ড্রয়িং রুমে ঢুকতে যাবে, তৃষা হঠাৎ একজোড়া স্যান্ডেল বের করে দিয়ে বললো, মোজা খুলে স্যান্ডেল টা পড়ো।

আশরাফের মনে হইতেছিলো, গতকাল ই তৃষার সাথে দেখা হয়েছে। আগের মতো অথচ এত বছর পর দেখা, কিভাবে ও এত স্বাভাবিক ব্যবহার করছে। ও তো ভিতরে অসম্ভব নার্ভাস ফিল করছে। আশরাফ মোজা পড়েই স্যান্ডেল পায়ে দিচ্ছিলো। তৃষা বললো;
তুমি কি সারা রাত মোজা পড়ে থাকবে?

আশরাফ ইতস্তত করে বললো; বিদেশে যাবার পর, একদিন ওখানকার সবুজ ঘাসে, কিশোর বয়সের মতো খালি পায়ে খুব ফুটবল খেলতে ইচ্ছ  হলো। ভাইয়ের ছেলেদের নিয়ে খেললাম। ওরা তো ট্রেইনার পরে খেলছিলো। খেলা ভালোই হলো, কিন্তু মাঝখান থেকে, আমার সবুজ ঘাসে খালি পায়ে খেলার মাশুল দিতে হলো। 

মানে? বুঝলাম না। 

আমার পায়ের আঙ্গুলে খুব জোরে ব্যথা পেয়ে, একটা নখ নষ্ট হয়ে গেছে, সবার সামনে আনইজি লাগে।

হইছে, আমার সামনে লজ্জা আর লজ্জা পেতে হবে না। “মোজা খুলবা? না আমি খুলে দিবো? তোমার বিদেশী বউ কি মোজা খুলে দেয় ? 
আশরাফ যতো দেখছে, আর অবাক হচ্ছে, তৃষা তো আগে এতো কথা বলতো না। বেশির ভাগ ই শুনতো আর হাসতো। আশরাফ আমেরিকা যাওয়ার পর পড়াশোনা শেষ করে, একটা আইটি কোম্পানিতে চাকুরী নেয়। ওখানেই এক আমেরিকান মেয়ের সাথে পরিচয় হয়, পরে বিয়ে। ওর দুই ছেলে।

তৃষা জিজ্ঞেস করলো, চা খাবে? নাকি একবারে ডিনার? না, ডিনার দেরি করে খাই। চা দাও।

তৃষা চা দিয়ে টেবিলে আসতে বললো। আশরাফ এসে বসতেই শিঙ্গাড়ার প্লেট এগিয়ে দিতে বললো, একটা খাবো, না হলে ডিনার করতে পারবো না।

তুমি আগে, চায়ের সাথে গরম গরম সিংগাড়া খেতে ভালবাসতে মনে আছে? তাই আনিয়েছি। কিন্তু ঠান্ডা হয়ে গেছে। গরম করে দিবো?
আশরাফ বললো; তুমি একটু বসতো চুপ করে। কিছু করতে হবে না। আমি সত্যি অবাক হচ্ছি, তুমি এতো কিছু মনে রেখেছো?

দুজনে বসে চা খেতে খেতে অনেক পুরনো গল্প করতে করতে কখন যে দু’ঘণ্টা পার হয়ে গেলো টেরই পেল না। অতীতে চলে গেছিলো। হঠাৎ তৃষার ফোন বেজে উঠলো। চমকে উঠে, বর্তমানে ফিরে আসে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তৃষা আশরাফের সামনেই কথা বলে। আশরাফ খুব মনোযোগ দিয়ে ওর স্বামীর সাথে কিভাবে কথা বলে শুনছিলো। কথা শেষ হলে, দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। নীরবতা ভঙ্গ করে  তৃষা বলে; যাও হাত মুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে নাও। সব গল্প এখুনি শেষ করবে? সারারাত তো পড়ে আছে। আমি, এগুলো ধুয়ে, খবর গরম করে ডিনার দেই।

ওকে একটি ঘর দেখিয়ে দিল। আশরাফ আস্তে আস্তে একটু সহজ হয়ে আসছিলো। তৃষা বের হয়ে যেতেই দু’একটি ফোন করলো। তারপর ওর বউয়ের সাথে কথা  বলে, ফোন টা বন্ধ করে, চার্জ এ দিলো। মনে মনে ভাবল, কালকে সকালের আগে আর ফোন খুলবে না। জীবনের এতো অভাবনীয় অভিজ্ঞতার প্রতিটি মুহূর্ত সত্যিকার ভাবে উপলব্দি করবে। আশরাফ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখে, তৃষা খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। তৃষা আর আশরাফ খাবার টেবিলে মুখোমুখি বসলো। তৃষার মনের ভিতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তৃষা আপ্রাণ চেষ্টাকরে যাচ্ছে শান্ত থাকতে। তারই অংশ হিসেবে সে আশরাফের দিকে একবারও তাকালো না। খাবার টেবিল জুড়ে নেমে এলো ভয়ঙ্কর এক শুনশান নীরবতা। কাঁচের বাটিতে চামচের আওয়াজটা প্রকট ভাবে কানে বাজছে তৃষার। নিস্তব্ধতারও যে একটা ভাষা আছে সেটা তৃষা আজ উপলব্ধি করলো। আজকে মনে হয় উপলব্ধি দিবস। খেতে বসেই আবারও আশরাফ অবাক। ওর পছদের কই মাছ, আলু ভর্তা, ডাল, ভাত, লেবু, কাচা মরিচ সবই টেবিলে। কিছুদিন আগে পুনরায় কথা বলার মাঝে কিভাবে তৃষা, ওর সব ভালো লাগা, মন্দ লাগা জেনে নিয়েছে। এতো খেয়াল করে ওর কথা শুনছে। এক সময় খুব চাইতো তৃষার সম্পূর্ণ মনোযোগ। যখন পেতো না তখন খুব মন খারাপ লাগতো। কিন্তু! এভাবে যে ওর সব কিছু মনে রাখবে তৃষা!!! কল্পনাতে ও ভাবেননি। 

আশরাফ এই বার নীরবতা ভেঙে বলেই বসলো, এই একটা চিমটি দাও তো আমাকে। এতোক্ষণ পর দুজনেই সহজ ভাবে হেসে ফেললো। খাওয়া শেষ করে, তৃষা বললো; তুমি ও ঘরে গিয়ে বসো, না হলে ঘর গুলো ঘুরে ঘুরে দেখো। আমি এগুলি গুছিয়ে আসি।

কেনো, আমিও তোমাকে সাহায্য করি। আমার তো বিদেশে এগুলি করে অভ্যেস আছে। 

এখন তুমি ঢাকায়, প্লিজ আমাকে শান্তি মতো কাজ করতে দাও তো। 

আমি কোথাও যাবো না, তুমি কাজ করো, আমি তোমাকে দেখি আর গল্প করি। 

তৃষা রান্না ঘর থেকে বের হয়ে, হঠাৎ ব্লুটুথ স্পিকার এনে, দুজনের প্রিয়, মান্নাদে’র গান ছাড়লো। আশরাফ জিজ্ঞেস করলো;

তুমি এখনো আগের মতো গান শুনো? 

সব জিনিষ ধুয়ে নিয়ে এসে, একটা একটা মুছে তৃষা গুছিয়ে রাখতে রাখতে উত্তর দিলো; 

হুম, গান না শুনে আমি কাজই করতে পারিনা। তুমি? তুমিও তো খুব গান শুনতে, মুভি দেখতে, বই পড়তে। করো এগুলি এখনও?
একটু চুপ থেকে, আশরাফ বললো ;

গানটা অফিসে যাওয়া আসার পথে শুনি এখনো। কিন্তু অনেক বছর বাংলা মুভি দেখা, বই পড়া আর হয়ে উঠে না। বাংলা চর্চা, পরিবেশ আমার বাসায় নেই। খুব মিস করি। প্রায়ই দেশে আসতে ইচ্ছে হয়। 

এক সাথে কথাগুলো বলে, চুপ হয়ে যায় আশরাফ। তৃষা ও চুপ থাকে, কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। হঠাৎ করেই তৃষা বলে; 
চলো আমরা আজকে দুজনে মিলে একটা বাংলা মুভি দেখি। অনেক দিন ধরেই শুনছি, রূপা গাঙ্গুলী আর সৌমিত্র চট্রপাধ্যায়ের, একটা খুব সুন্দর সিনেমা এসেছে দেখা হয়নি। দেখবে? 

আশরাফও খুব উৎসাহিত হয়ে বলে; তাই? ইস কতদিন দেখিনা, তাও আবার তোমার সাথে। এ সুযোগ কি ছাড়া যায়? কি  নাম? 

পুনশ্চঃ! নামটা উচ্চারণ করে তৃষা নিজেই একটু চমকে যায়। আশরাফ বলে উঠে, ইটারেস্টিং। তারপর কফির মগ নিয়ে দুজনেই, ড্রয়িং রুমে বসে। এখন তো অনেক সুবিধা। আগের মতো ভিসিআর, বা ডিভিডি তে সিডি কিনে দেখতে হয় না। স্মার্ট টিভিতে সব আছে। ইউটিউব থেকে তৃষা পুনশ্চ মুভিটা খুঁজে, দেখা শুরু করলো। দুজনের মনেই, অনেক ভাললাগা, সংশয়, দ্বিধা, সব অনুভূতির এক মিশ্রণ কাজ কাজ করছিলো। তাই, সাধারণ ভাবে যতটা না মনোযোগ দিয়ে সিনেমা দেখে, তারচেয়ে ও বেশি মনোযোগ দিয়ে দুজনই দেখছে। তার উপর এতো নামকরা অভিনেতা, অভিনেত্রী।

সিনেমা কিছুদূর এগোতেই, দুজন ই খেয়াল করলো, ঘরে যাকে বলে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। তৃষা শুনেছিল সিনেমাটা খুব সুন্দর, কিন্তু গল্পটা সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিলো না। ও কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলো। কিছুটা লজ্জাও লাগছিল। আশরাফ কি মনে করছে যে, ও ইচ্ছে করেই এমন একটা মুভি সিলেক্ট করলো। তৃষা বললো;

আমি আসলে আগে গল্পটা জানতাম না। কেমন লাগছে? ঘুমিয়ে পড়ছো না তো আবার ? দেখবে? না কি ঘরে গিয়ে ঘুমাবে? তুমিত বললে, সকালে তোমার কাজ আছে, আটটার মধ্যে বেরিয়ে যাবে।

আশরাফও একটু অস্বস্তি বোধ করছিলো, কিন্তু তৃষার কথায়, মুচকি হেসে বললো ; কি বলো? এতো ইন্টারেস্টিং টপিকস, ঘুম তো চলে গেছে।

আচ্ছা! আপনার কি মনে করছেন যে মুভিটা  খুব এডাল্ট সিনে ভরা কোন মুভি? না, মুভিটা খুব পরিচ্ছন্ন। কিন্তু রোমাঞ্চকর এবং পুরোটা সময় উৎকণ্ঠায় ভরা খুব চমৎকার একটা গল্প। একটু না বললে আমার গল্পের নামের সার্থকতা বিনষ্ট হবে। 

সিনেমার গল্প : এক বিধবা মহিলা তার একটি মেয়ে। মহিলা কিশোরী বয়সে, যখন কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন তখন একজনের সাথে বন্ধুত্ব এবং তারা একে অপরকে ভালোবাসতেন। পড়া শেষ করার পর কোনও কারণে তাদের বিয়ে হয়নি। পরবর্তীতে সেই ভদ্রলোক অনেক বড় লেখক হন। উনিও বিয়ে করেন এবং এক ছেলে, বিদেশ থাকে। কিন্তু তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিলো না। বহু বছর পর, বই মেলায় দুজনের দেখা। তারপর থেকে মাঝে মাঝে কথা হতো। মহিলা কলকাতায় থাকতেন, ভদ্রলোক দিল্লিতে। একবার এক সাহিত্য পুরস্কার নিতে উনার কলকাতায় আসার কথা। ভদ্রলোকের সব গল্পের নায়িকার চরিত্র ই উনার প্রথম ভালোবাসার মানুষকে মাথায় রেখেই সৃষ্টি করেছেন। দুজনেরই বয়স হয়েছে, ছেলে মেয়েরাও অনেক বড় হয়েছে। 

কলকাতার অনেক বড় একটা সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানে, উনি সেই মহিলাকে আসতে অনুরোধ করলেন। মহিলা রাজী হলেন না। কিন্তু বললেন, আমি কি তোমার কাছে এই শেষ বেলায় কিছু চাইতে পারি? ভদ্রলোক বললেন, বলো। ভদ্র মহিলা বললেন, “তুমি তো কলকাতা আসছোই ঐদিন ফিরে না যেয়ে আমায় চব্বিশটা ঘণ্টা দিবে। চব্বিশ ঘণ্টার সংসার করতে চাই।“ ভদ্রলোকের ও খুব ইচ্ছে ছিলো, বহু বছর দেখা নেই। মনে মনে ভাবলেন এ বয়সে কি এমন হবে একটা দিন এক সাথে কাটলে। তাই দুজন কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। ভদ্রলোক পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওনার অনুষ্ঠান শেষে রাতে মহিলার বাড়িতে আসেন। গল্প করে, ডিনার শেষে, মহিলা তাকে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে, টেবিল গুছাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই ভদ্রলোক অসুস্থ বোধ করেন এবং মারা যান। 

মুভি শেষ হলে তৃষা আর আশরাফ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তৃষা বলে, চলো, বারান্দায় বসি একটু। বারান্দায় এসে আশরাফ তৃষার অনুমতি নিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। তৃষা বলে; কি চুপ হয়ে গেলে এতো? মুভি টা দেখে ভয় পেয়েছো?

আশরাফ হেসে ফেললো। তারপর বলে; হুম, একটু ভয় পেয়েছি। আশ্চর্য ! দেখো অবিশ্বাস্য ভাবে আজকে, তোমার বাসায় সারারাত গল্প করার লোভে থেকে তো গেলাম। যদি মুভির মতো কিছু হয় তখন কি করবে? তোমার ভয় লাগেনি?

তৃষা হাসতে হাসতে বললো, “তুমি এখানে মরে গেলে, তোমার খুব বদনাম হয়ে যাবে।সেটাই তোমার চিন্তা? তুমি মোর গেলে কিছুইতো টের পাবে না। সব কিছুইতো আমাকে ফেস করতে হবে। আর যদি উল্টোটা হয়, অর্থাৎ আমি মরে গেলাম। তখন তুমি কি করবে?” এ রকম রসিকতা করতে দেখে, আশরাফ চুপ করে থাকে। কি বলবে বুঝতে পারছিলো না। তৃষা বলে, এতো ঘাবড়াবার কিছু নাই। ইন শা আল্লাহ, তোমার কিছু হবে না। ভালো মানুষেরা তাড়াতাড়ি মরে যায়। তুমি যাবে না। আর আমি যদি মোর যাই, তুমি দরজা খুলে, চুপচাপ চলে যেও। কেউ জানবেও না। রাত তো অনেক হলো, একটু ঘুমাও।

আশরাফ তৃষার দিকে তাকিয়ে, ভাবছে জীবনে মাঝে মধ্যে সত্যিই কতো অকল্পনীয় ঘটনাও ঘটে। ঠান্ডা হওয়া, বারান্দায় দুজন বসে আছে, চারিদিকে চুপচাপ, চাঁদের আলোয়ে খুব মায়াবী লাগছে। বাস্তবে আর কখনও এমন করে এতো কাছে থেকে সারা রাত তৃষা কে দেখতে পারবে না। তাই না ঘুমিয়ে মন ভরে প্রতিটা মুহূর্তকে চোখ দিয়ে মনের মধ্যে বন্দী করে রাখতে চায়, আশরাফ। গল্প করতে করতে ভোরের আলো ফুটে উঠলো। 

তৃষা বললো; তুমি কী একটু শুবে? 

আশরাফ বললো; না আর শুবো না। জরুরী কিছু কাজ আছে। শুধু একটু চা করে দাও। আর কিছু দিও না। হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ই বেরিয়ে যাবো।

তৃষা উঠে গিয়ে চা বানিয়ে আশরফকে টেবিলে ডাকলো। আশরাফ এসে দেখে টেবিলে, খেজুরের গুড়ের পায়েস আর বোয়ামে মুড়ি।

তৃষা বললো; রাতে দিতে ভুলে গেছিলাম।

আশরাফ আর না বলতে পারলো না। তারপর বলে, তুমি তো একদিনে ই আমার স্বভাব নষ্ট করে দিচ্ছো। 

জুতো মুজা পড়ে বের হবার সময়, দরজার কাছে গিয়ে, আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে, আশরাফ এক নিঃশ্বাসে বললো; তুমি জানো আমি তোমাকে খুব পছন্দ করতাম এক সময়, পরেও তোমাকে নিয়ে ভাবতাম মাঝে মাঝে। তোমাকে এক বার দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। এভাবে তোমার সাথে একটা রাত কাটাতে পারবো, কল্পনাতেও ভাবিনি। এ যেন মেঘ না চাইতে ই বৃষ্টি। সারাটা জীবন এই দুর্লভ মুহূর্ত স্মৃতির পাতায় থেকে যাবে। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।

তৃষা ও গতকাল থেকে বুঝতে পারছিল মনের কোথায় যেন একটা লুকানো দূর্বলতা আছে আশরাফের জন্য। না হলে সে এতটা দুঃসাহসিক পদক্ষেপ কেন নিবে। আশরাফের কথাগুলি শুনে তৃষা চুপ করে থাকলো। কিছু বললো না।

আচমকাই তৃষার কপালে একটা চুমু খেয়ে, দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো আশরাফ। তৃষা, কিছুক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর বাথরুমে গিয়ে অনেকক্ষণ মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। মনে মনে ভাবছিল, গত কয়েক ঘণ্টা কি তার জীবনে সত্যি ছিল না স্বপ্ন।  


মন্তব্য