উন্নয়নের নামে গাছ কাটার হিড়িক, দাবদাহে পুড়ছে দেশ

দাবদাহে
  © সংগৃৃহীত

প্রচণ্ড দাবদাহে পুড়ছে দেশ। তাপমাত্রা রেকর্ড মাইলফলক ছুঁয়েছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে। গতকাল মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ছিল ৪৩.২ ডিগ্রী ও যশোরে সর্বোচ্চ ৪৩.৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এমন তীব্র গরম থেকে বাঁচতে মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে গাছের ছায়ায়। সারাদেশ জুড়ে আলোচনা চলছে, কি করে আরও গাছ রোপন করে ভবিষ্যতে এই গরমের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে ভিন্ন চিত্র দেখা মেলে যশোর-নড়াইল সড়কে। প্রখর রোদের মধ্যেও থেমে নেই যশোর-নড়াইল সড়কের গাছ কাটা।

প্রচণ্ড দাবদাহে পুড়ছে যশোর। এপ্রিলের শুরু থেকেই এই অবস্থা। গতকাল মঙ্গলবার এ জেলায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আলোচনায় এসেছে উন্নয়নকাজের জন্য যশোর জেলা পরিষদের গাছ নিধনের বিষয়টি। গত ৬ বছরে জেলা পরিষদ চার হাজারের বেশি গাছ কেটেছে। এখনো কাটা হচ্ছে ৯৬১টি। কিন্তু এই ছয় বছরে রোপণ করা হয়নি একটি গাছও।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, যশোরে ছয় বছরে সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদের মালিকানাধীন ৪ হাজার ২০০ গাছ কাটা হয়েছে; যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৮ সালে যশোর-খুলনা মহাসড়কে ১ হাজার ৮৯৫টি গাছ কাটা হয়েছে; যার মূল্য ছিল ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। ২০২১ সালে যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের হৈবতপুর ব্রিজ এলাকা থেকে ১২টি গাছ কাটা হয়; যার মূল্য ৬ লাখ ৬২ হাজার টাকা। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কে ৮৩৫টি গাছ কাটা হয়; যার মূল্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২২ সালে যশোরের রাজারহাট থেকে চুকনগর মহাসড়কে ৫০৭টি গাছ কাটা হয়; যার মূল্য ছিল ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। বর্তমানে যশোর-নড়াইল সড়কে ৯৬১টি গাছ কাটা চলমান রয়েছে; যার মূল্য ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ ছাড়া যশোর-বেনাপোল (ঐতিহাসিক যশোর রোড) সড়কে শতবর্ষী গাছ বিক্রির উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ৬৯৭টি। তবে আন্দোলন ও হাইকোর্টে নিষেধাজ্ঞায় তা বন্ধ রয়েছে।

যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের চুড়ামনকাটি বাজারের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, সাত মাস আগেও এই সড়কের যশোর অংশে বড় বড় গাছ ছিল। এখন আর নেই। এভাবে গাছ নিধনের কারণেই পরিবেশের বিরূপ অবস্থা। উন্নয়নের জন্য গাছ কাটা হলেও এই সড়কের পাশে যদি আবার নতুন করে গাছ লাগাত, তাহলেও কিছুটা রক্ষা হতো।

বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. ছোলজার রহমান বলেন, পরিবেশের প্রতি অতীত ও বর্তমানের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক আচরণের পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণ এই অঞ্চলের উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। গত এক দশকে এই অঞ্চলের অনেক সড়ক ও মহাসড়কের দুই পাশের বৃক্ষ উজাড় করা হয়েছে। এর মধ্যে যশোর-খুলনা, যশোর-ঝিনাইদহ, যশোর-বেনাপোল, যশোর-চৌগাছা-মহেশপুর, যশোর-চুকনগর সড়ক অন্যতম। জমির হিসাবে সড়কের পাশ থেকে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির গাছ উজাড় করা হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের অতি জরুরি ভিত্তিতে বেশি বেশি বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দিতে হবে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে যশোর রোড উন্নয়ন ও শতবর্ষী গাছ রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, সড়ক উন্নয়ন হবে, সেটা তো ভালো কথা। গাছ রেখেও পার্শ্ববর্তী দেশে উন্নয়ন চলছে। কিন্তু এখানে তা হচ্ছে না। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল দায়িত্ব নেওয়ার পর অপরিকল্পিতভাবে গাছ সাবাড় করেছেন। কখনো একটি গাছও লাগাননি।

এ বিষয়ে যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান বলেন, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জেলা পরিষদকে গাছ অপসারণের চিঠি দেয়। সেই চিঠির আলোকে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির অনুমোদন ও বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন সাপেক্ষে গাছ কাটার দরপত্র আহ্বান করা হয়। গাছ বিক্রির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল বলেন, গাছ লাগানোর জন্য আমাদের কোনো নির্দেশনা ছিল না। সড়কগুলো কত লেন হবে, সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি; ইচ্ছেমতো জায়গায় গাছ লাগালে তো আর হবে না। আমরা এবার সওজে রাস্তার শেষ সীমানা বের করে দেয়ার চিঠি দেব। বিগত সময়ের গাছ বিক্রির টাকার ফান্ড আছে ব্যাংকে। নির্দেশনা পেলে আমরা গাছ লাগাব।


মন্তব্য


সর্বশেষ সংবাদ