কমছে কৃষি জমি, কৃষকদের খাদ্য সংকটের আশংকা

কালাই
  © টিবিএম

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় গত তিন বছরে ২১ হেক্টর ফসলী জমিতে পুকুর খনন ও অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অরুণ চন্দ্র রায়। তবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। চলতি বছরে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও পুকুর খনন, হিমাগার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং ইট ভাটায় কৃষি জমি থেকে মাটি কেটেঁ বিক্রয় করার কারণে প্রায় ২শ’ হেক্টর জমিতে ইরি ধান চাষ কম হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও উচ্চ আদালত বারবার কৃষি জমি রক্ষার তাগাদা দিলেও সেই আদেশের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ মদদে প্রভাবশালী চক্র তিন (৩) ফসলি জমির মাটি খনন করে পুকুর তৈরি, আলুর হিমাগার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করছে এবং পার্শ্ববর্তী উপজেলার ইটভাটার মালিকরা তিন (৩) ফসলি জমি থেকে মাটি কিনে কেটেঁ নিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কৃষকদের অধিক অর্থের লোভ দেখিয়ে কৃষি জমির টপ সয়েলগুলো কেটেঁ ব্যবহার করছে ইট ভাটায়। ফলে তিন (৩) ফসলি কৃষি জমিগুলো পুকুর ও জলাশয়ে পরিণত করা হচ্ছে এবং প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে প্রয়োজন অতিরিক্ত আলুর হিমাগার।

এদিকে, ইউএনও কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে ৩০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৪ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে এক্সক্যাভেটর মেশিনের ব্যাটারি। টায়ারগুলো করে দেওয়া হয়েছে অকেজো। তৎসত্ত্বেও প্রশাসনের অভিযানের পরেও বন্ধ হচ্ছে না পুকুর খনন ও আলুর হিমাগার নির্মাণের কাজ। প্রশাসন এ বিষয়ে অভিযানে যাওয়ার আগেই খবর পেয়ে যায় খননকারীরা ও হিমাগারের লোকজন। তখন তারা কাজ বন্ধ রেখে সটকে পড়ে। প্রশাসনের লোকজন চলে যাওয়ার পরেই ফের শুরু হয় খনন ও নির্মাণের কাজ। এগুলো সবই লোক দেখানো অভিযান বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় এলাকাবাসী। মামলা, জেল, জরিমানা ও খননযন্ত্র জব্দ এবং অকেজো করেও থামানো যাচ্ছে না প্রভাবশালী এই মাটি ব্যবসায়ীদের।

উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে সরজমিনে গিয়ে আমিরুল ইসলাম, সাইদুর রহমান, ইউনুস আলি, খলিলুর রহমান ও ওবায়দুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, আলু ও ধান চাষে কালাই উপজেলা জেলার শীর্ষে অবস্থান করছে। 'আলু আর ধান' 'কালাই এর প্রাণ' এই স্লোগানকে ধারণ করে কৃষকেরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে কৃষিতে অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু কিছু অসাধু প্রভাবশালীরা এক্সকাভেটর দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর গর্ত করে তিন (৩) ফসলি কৃষি জমির মাটি কেটে নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে ফসলি জমি চিরতরে মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে।সেগুলোর শ্রেণি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে জলাশয়ে ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে। এভাবে গভীর গর্ত করায় পাশের কৃষি জমিও ভেঙে পড়ছে। ফলে কিছু কিছু জমির মালিক অধিক টাকার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে মাটি বিক্রি করছে আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে হিমাগার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। উপজেলাজুড়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর কৃষি জমি রয়েছে। শ্রেণী ভেদে প্রায় সকল জমিতেই সারা বছর কোনো না কোনো ফসল চাষ করা হয়। ধান চাষে লাগাতার লোকশান হওয়ার কারণে কৃষকরা ভাটার মালিকদের দ্বিগুন অর্থের লোভে ট্রাক্টরপ্রতি ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় এক ফিট গর্ত করার শর্তে প্রতি বিঘায় প্রায় ১৮হাজার টাকার মাটি বিক্রয় করছে কৃষকরা। প্রায় প্রতিদিনই ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্রলি, ট্রাক্টর,মিনি ট্রাক দিয়ে কৃষি জমি থেকে অবাধে ভাটার মালিকরা ইট তৈরির কাজে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পাশাপাশি দিন দিন কমে যাচ্ছে কৃষিজমির পরিমাণ। কমে যাচ্ছে ফসলের উৎপাদন ও জমির উর্বরতা শক্তি।

W3

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ অরুণ চন্দ্র রায় বলেন, উপজেলায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে জমির মাটি বিক্রির প্রবণতা। ‘ফসলি জমির উপরিভাগের টপ সয়েল ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। এটা কৃষি উৎপাদনের জন্য খুবই ক্ষতিকর। জমির এই টপ সয়েল তৈরি হতে ২০-৫০ বছর সময় লেগে যায়  কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কৃষককে সচেতন করা হচ্ছে।তিনি ফসলি জমি থেকে মাটি কাটা বন্ধে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।W4 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবুল হায়াত বলেন,মূলত এই উপজেলার প্রাণ হচ্ছে ফসলি জমি। যেখানে সরকার ইঞ্চি পরিমাণ জমি আবাদি রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন সেখানে ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি বা হিমাগার নির্মাণে কৃষি ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং মূল হোতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাটির উর্বর অংশ বিক্রি না করার জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধও করা হচ্ছে।


মন্তব্য