রাণীয়ালি গ্রামে অদৃশ্য জিন সাপের কামড়ে হাসপাতালে ১০

যশোরে
  © সংগৃহীত

যশোরের সীমান্ত উপজেলা চৌগাছার রাণীয়ালি গ্রামে জ্বীন সাপ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।  সোমবার (৮ জুলাই) গ্রামটির নারী-তরুণীসহ ১০ জন যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।  এসব ব্যক্তিদের হাত ও পায়ে লাল ক্ষত চিহৃ দেখা গেছে।  আবার কারোর কোনো ক্ষত চিহৃ নেই কিন্তু শরীরে হঠাৎ জ্বালা-পোড়া করছে বলে চিকিৎসাধীনরা জানিয়েছেন।  ভর্তি হওয়াদের অনেকেই বলছেন ঘুমন্ত অবস্থায় শরীরে জ্বলনি উঠেছে।  কেউ বলেছেন কাজ করার সময় হঠাৎ জ্বালা-পোড়া শুরু হওয়ায় তারা হাসপাতালে এসেছেন।

গেল এক সপ্তাহে গ্রামটিতে অদৃশ্য সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। এর মধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০ জন।  বাকিরা স্থানীয় ওঁঝা ও কবিরাজের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন।

সোমবার বিকালে স্থানীয় পাশাপোল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য গোবিন্দ চন্দ্র ঢালী বলেন, গত বুধবার রাতে সাপে দংশনের শিকার হন রাণীয়ালি গ্রামের আব্দুর হকের স্ত্রী রাবেয়া বেগম। এরপর যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাবেয়ার পরের দিন মৃত্যু হয়। তার পর থেকে এলাকায় সাপ আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন কিন্তু কেউ সাপ দেখেনি। শরীরে জ্বালাপোড়া আর জ্ঞান হারানো ঘটনা ঘটলেই ওঝা কবিরাজদের কাছে যাচ্ছেন। ওঁঝারা শরীরে বিষের উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই কেউ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, কেউ বা স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ও কবিরাজের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত গ্রামটিতে ৩০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ১০ জনের মতো যশোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।

যশোর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের রাণীয়ালি গ্রাম থেকে রোববার ও সোমবার ১০ জন রোগী কোনো কিছুর দংশনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে নারী ৮ জন ও দুইজন পুরুষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব ব্যক্তিদের হাত ও পায়ে লাল দাগ রয়েছে। আবার দাগ ছাড়াও কেউ কেউ ভর্তি হয়েছেন। ১০ জনকেই ভর্তি রেখে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছেন। সাপে কামড়ানোর তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। তাই অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন দেওয়া হয়নি তাদের।

যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি রাণীয়ালি পশ্চিমপাড়ার এলাকার মিথুন মণ্ডলের স্ত্রী প্রান্ত মণ্ডল (৩৩) বলেন, রোববার সকালে রান্নাঘরের শুকনা কাঠ সাজাচ্ছিলাম। এ সময় হাতে কিছু একটা কামড় দিলে জ্বলে উঠে। হাতের ডান হাতের কবজিতে লাল দাগ সৃষ্টি হয়। বাড়ির লোকজনের পরামর্শে স্থানীয় ওঁঝার কাছে গেলে তিনি আমার শরীরে বিষের উপস্থিতি টের পান। এরপর রোববার রাতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।

রাণীয়ালি হাই স্কুলপাড়া এলাকার উৎপল মণ্ডলের স্ত্রী তমালিকা (২২) বলেন, রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম। সকালে দেখি হাতে জ্বলছে। এক পর্যায়ে হাত অবশ হয়ে যায়। সেখানে কিছু একটা কামড়ের দাগ রয়েছে। ওঝার কাছে গেলে বিষের উপস্থিতি পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখন অনেকটা সুস্থ রয়েছি।

স্থানীয় সন্তোষ কুমার মণ্ডল বলেন, কয়েক দিন আগে একজন মারা যাওয়ার পর থেকে সাপ আতঙ্কে রয়েছি আমরা কিন্তু সাপ দেখেনি কেউ। কবিরাজ ওঁঝার কাছে গেলে তারা বলছে, জিন সাপে কেটেছে। জিন সাপ তার নাতনির পায়ে কামড়ায়। এরপর ঝিকরগাছার বাঁকড়া ওঁঝার কাছে নিয়ে গেলে ঝাড়ফুঁক করেছেন। এই বৃদ্ধার ভাষ্য তাদের পরিবারের একজনসহ গত এক সপ্তাহে রাণীয়ালি গ্রামে প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষকে জিন সাপ কামড়েছে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র নার্স শিউলি সরকার বলেন, মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে বর্তমানে ৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তারা বলছেন, তাদের সাপে কেটেছে। তবে সাপে কাটার তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। তাদের ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তারা সবাই সুস্থ রয়েছেন।

এদিকে গ্রামের বেশ কয়েকজন জানান, সাপে কাটার কথা শোনা গেলেও কেউ এখনো সেই সাপ দেখেননি। কবিরাজ-ওঁঝারা বলছেন, এটি জিন সাপ। গ্রামের সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাসও করছেন। ব্যাস! রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। অনেকেই স্থানীয় ওঁঝা কবিরাজের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছেন। জিন সাপে আতঙ্কের সুযোগ নিয়েছেন স্থানীয় ওঁঝা, সাপুড়ে, কবিরাজরাও। জিন সাপে দংশিত হচ্ছে মানুষ- এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে তারা লুটে নিচ্ছে জনসাধারণের অর্থ।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, অনেকেই আতঙ্কে ভর্তি হচ্ছেন। ভর্তি রোগীরা সবাই সুস্থ রয়েছেন।

তিনি বলেন, মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। বাড়িঘরের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখতে হবে। কোনো সাপ কামড়ালে সরাসরি হাসপাতালে চলে আসা উচিত। এছাড়া সাপে কামড়ালে সেটির ছবি তুলে রাখতে পারলে চিকিৎসা দেওয়া অনেকটাই সহজ হয়। হাসপাতালে সাপে কাটার ওষুধের কোনো সংকট নেই।


মন্তব্য


সর্বশেষ সংবাদ