জার্মান সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি পেলেন বাংলাদেশি জাকারিয়া

জার্মানি
  © ডয়চে ভেলে

চলতি বছর জার্মান সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি 'ফেডারেল ক্রস অব মেরিট' অর্জন করেছেন বাংলাদেশি চিকিৎসা পদার্থবিদ অধ্যাপক ড. গোলাম আবু জাকারিয়া৷ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি এই সম্মাননা পেলেন।

গতকাল শুক্রবার (২২ মার্চ) সন্ধ্যায় জার্মানির ভিল শহরে বুর্গহাউস বিয়েলস্টাইন ভবনে অধ্যাপক ড. গোলাম আবু জাকারিয়ার হাতে সম্মাননা সনদ তুলে দেন ভিলের লান্ডার্ট (জেলা প্রশাসক) ইয়োখেন হাগট৷ জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ারের পক্ষ থেকে ‘ফেডারেল ক্রস অব মেরিট' স্মারকটিও অধ্যাপক জাকারিয়াকে পরিয়ে দেন তিনি৷

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন ভিল শহরের মেয়র উলরিখ স্ট্যুকার, জার্মানিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (রাজনীতি) তানভীর কবির, জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় গণমান্য মানুষেরা৷

জার্মানির সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব জয়ী এই চিকিৎসা পদার্থবিদ কথা বলেছেন জার্মানির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের সঙ্গে৷ গোলাম মো. জাকারিয়া বলেন, ‘‘পেশাগত জীবনে অনেক কাজ করেছি জার্মানিতে এবং বাংলাদেশে৷ এই সম্মাননা যে পাবো, সেটা আমি কোনোদিন চিন্তা করিনি৷ এই সম্মাননা পেয়ে মনের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে৷''

প্রথম কোনো বাংলাদেশি এবং বাঙালি হিসেবে এমন বিরল সম্মাননাজয়ী এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘‘এটা আমার কাছে অদ্ভুত ব্যাপার লাগে৷''

৭০ বছর বয়সি ড. জাকারিয়ার জন্ম বাংলাদেশের নওগাঁর ইকরকুড়ি গ্রামে৷ ইন্টারমিডিয়েটের পর ভর্তি হয়েছিলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ কিন্তু দেশ স্বাধীনের পরের বছর বৃত্তিধারী শিক্ষার্থীদের একজন হয়ে প্রথম ব্যাচেই জার্মানিতে পা রাখেন তিনি৷ শুরুতে জার্মান ভাষা রপ্ত করার দিকে মনোযোগী হয়েছিলেন তিনি৷ ভাষাটা শেখার পর প্রকৌশল বিদ্যার কথা ভুলে মেডিক্যাল ফিজিক্স বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি৷

সফল এই মানুষটি পরবর্তীতে দেশটির আনহাল্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সের ক্লিনিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপনা করেছেন৷ এছাড়াও কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যুমারসবাখ টিচিং হাসপাতালের মেডিকেল ফিজিক্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি৷

মরণব্যাধি ক্যানসার চিকিৎসায় মেডিকেল ফিজিসিস্টেরগুরুত্বটা আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ড. জাকারিয়া৷ 

ডয়চে ভেলেকে আবু জাকারিয়া বলেন, ‘‘যেখানে মেডিসিন আছে, সেখানেই আমরা এই সায়েন্সকে ব্যবহার করতে পারি৷ মূলত রেডিয়েশন যেখানে ব্যবহার করা হয়, আজকের জগতে সেখানেই এটির ব্যবহার রয়েছে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘মনে করেন, একজন ডাক্তার ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা করবেন৷ তার জন্য তিনটি মোডালিটি আছে: সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি৷ যখন রেডিওথেরাপি করবে, সেটি রেডিয়েশন দিয়ে৷ কিন্তু রেডিয়েশন তো দেখা যায় না, শোনা যায় না, এর স্বাদ নেই৷ কিন্তু সেটা আমরা শরীরে ব্যবহার করছি৷ শরীরে যেখানে ক্যানসার সেখানে যদি এটি দিতে পারি, তাহলে ক্যানসার আরোগ্য হবে৷ কিন্তু যেখানে ক্যানসার নেই, সেখানে যদি এটা পরে, তাহলে কিন্তু আবার ক্যানসার হবে৷ এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার না? সেজন্য আমাদেরকে এমনভাবে দিতে হবে, যেখানে ক্যানসার সেখানেই এবং আশেপাশের সব কোষগুলোকে বাঁচাতে হবে৷''

আর এ কাজটি মেডিকেল ফিজিসিস্টরাই করতে পারেন বলে জানালেন এই তিনি৷ বললেন, ‘‘কারণ চিকিৎসকেরা জানাবেন, এই স্থানে ক্যানসার, আমি সেখানে রেডিয়েশন দিতে চাই৷ তুমি এখন দেখ, কিভাবে কী করা যায়৷ রেডিয়েশন শরীর ভেদ করে যাচ্ছে, কিন্তু যেখানে ক্যানসার আক্রান্ত অংশ রয়েছে শুধু সেখানেই সেটি কার্যকর হবে৷ এজন্য প্রচুর অ্যালগরিদম রয়েছে৷ বিজ্ঞানের অনেক ব্যবহার আছে৷ কম্পিউটারের সাহায্যে আমরা কাঙ্ক্ষিত স্থানে রেডিয়েশন পৌঁছাতে পারি৷''

আর এটাকেই চিকিৎসা পদার্থবিদ্যার অন্যতম বিশেষত্ব হিসাবে মনে করেন তিনি৷ হাজার পঞ্চাশেক মানুষকে সুস্থ করে তুলেছেন এই মানুষটি৷ আর সেটাকেই জীবনের বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন প্রবাসী এই বাংলাদেশি৷

অধ্যাপক জাকারিয়া বলেন, জার্মানিতে ‘‘আমার তো মনে হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ আমার অধীনে এই চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের ব্যথা আমি কমাতে পেরেছি৷ বিজ্ঞানের একজন মানুষ হয়ে এতো রোগীকে সুস্থ করা ও তাদের ব্যথা কমানো—এটা আমার জন্য বিরাট ব্যাপার৷''

জার্মানির উন্নত জীবনযাপনে তিনি নিজেকে আটকে রাখেননি৷ চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অংশটিকে তিনি বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠা করার পেছনে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা৷ জার্মানি ও বাংলাদেশের সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং জার্মান সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশে মেডিক্যাল ফিজিক্সের বিকাশে প্রয়োজনীয়  পদক্ষেপও নিয়েছেন তিনি৷

ড. জাকারিয়া বলেন, ‘‘এই বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করেছি৷ এ পর্যন্ত ব্যাচেলর ও মাস্টার্স মিলিয়ে প্রায় দুইশোর মতো ছাত্র আমি তৈরি করেছি৷''

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মেডিকেল ফিজিক্স নিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মাস্টার্সে অধ্যয়নের সুযোগ তৈরি করেন তিনি৷ পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেয়ারও সুযোগ তৈরি করেন আবু জাকারিয়া৷ বাংলাদেশ যেসব হাসপাতালগুলোতে ক্যানসার রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়, সবখানেই তার হাতে গড়া শিক্ষার্থীরা রয়েছেন বলে জানান তিনি৷

তিনি বলেন, ‘‘এটা আমার জন্য একটি সত্যিই সৌভাগ্য৷ জার্মানিতে বাস করে জার্মানিতে শিক্ষকতা করা, আবার বাংলাদেশেও করতে পারলাম৷ এটা অদ্ভুত ব্যাপার৷''

ক্যানসার চিকিৎসায় অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ড. জাকারিয়া অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন৷

জীবনের দীর্ঘ সময় পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মাঝে বাস করেও অধ্যাপক জাকারিয়া মনেপ্রাণে বাংলাদেশের জাতিসত্তা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকেও লালন করে চলেছেন৷ প্রবাসী বাংলাদেশি ও জার্মান বন্ধুদের নিয়ে ভিল শহরে, ১৯৯৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ স্টাডি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (বিএসইজেড) নামের একটা সংগঠন৷ এর মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্থসামাজিক, বৈজ্ঞানিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করে চলেছেন৷

বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে জার্মানদের কাছে পৌঁছে দিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে জার্মান ভাষায় বই প্রকাশ করেছেন৷

যে গ্রামে জন্মেছেন, বেড়ে উঠেছেন, শৈশব কাটিয়েছেন নওগাঁর সেই ইকরকুড়িতে তৈরি করেছেন স্কুল ও হাসপাতাল৷ এসব কর্মযজ্ঞকে আরো এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ‘আলো ভুবন' নামে একটি ট্রাস্টও গঠন করেছেন তিনি৷ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নবায়নযোগ্য শক্তিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প রয়েছে ট্রাস্টটির৷

এর মধ্য একটি হলো, ‘সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড ক্যান্সার রিসার্চ (এসসিএমপিসিআর)' এই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যানসার চিকিৎসায় দক্ষ জনবল তৈরি, উচ্চতর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিদেশি প্রশিক্ষকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন, রোগ নির্ণয়, সচেতনতা সৃষ্টি ও গবেষণার ক্ষেত্র বাড়াতে চান তিনি৷ আলো ভুবন ট্রাস্টটি ক্যানসার প্রতিরোধ ও স্ক্রিনিং নিয়েও কাজ করছে৷

সূত্র: ডয়চে ভেলে


মন্তব্য