জেদ থেকে স্বপ্নের কারখানা ‘এমকেএস’ স্পোর্টস, আনুষ্ঠানিক যাত্রায় তারার মেলা

ইমরুল
  © ফাইল ছবি

২০১৮ সালের একটি ঘটনা শোনালেন ইমরুল কায়েস। ভারতে একটি ব্যাটের কারখানায় গিয়েছিলেন তিনি, যাদের ব্যাট তিনি ব্যবহার করেন। অনেক ক্রিকেটারই এরকম মাঝেমধ্যে কারাখানায় গিয়ে নিজের পছন্দমতো ব্যাট বাছাই করেন। ইমরুল সেবার গিয়ে দেখলেন, খুব ভালো ভালো ব্যাট আছে সেখানে, যেগুলো তিনি বা তারা টাকা দিয়েও পান না। দেশে ফেরার পর কয়েক দফায় পছন্দের ব্যাট না পেয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মনোমালিন্য হলো ইমরুলের। কথা কাটাকাটিও হলো। এক পর্যায়ে তিনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন, “আমি নিজেই ব্যাটের কারখানা দেব।” ওই প্রতিষ্ঠানের লোকেরা বললেন, ‘কিভাবে দেবে?’ ইমরুলের প্রত্যয়ী জবাব ছিল,  “সেটা সময় হলেই দেখতে পাবে।”

সেই যে জেদ ধরেছিলেন ইমরুল, ক্রমে তা রূপ নিয়েছে ধাবমান এক স্বপ্নে। বাংলাদেশের হয়ে ১৩১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ব্যাটসম্যান হাল ছাড়েননি। সেই স্বপ্নের পথ ধরেই জন্ম দিয়েছে ব্যাট প্রস্তুতকারী কোম্পানি ‘এমকেএস স্পোর্টস। কারখানা থেকে শুরু করে পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর কাজ চলছে গত দুই বছর ধরেই। 

অবশেষে এই প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো সোমবার রাতে। রাজধানী একটি হোটেলে জমকালো উদ্বোধনী আয়োজনে ছিল বসেছিল তারার মেলা। মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ, তাইজুল ইসলামসহ অনেক ক্রিকেটার ছিলেন সেখানে। ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী নাজমুল হাসান, যিনি বিসিবি সভাপতিও। বিসিবি পরিচালক ও সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ, আরেক বিসিবি পরিচালক ও সাবেক ক্রিকেটার জালাল ইউনুসও এসেছিলেন শুভেচ্ছা জানাতে।

কারখানা তৈরির আগে প্রাথমিক পর্যায়ে এমন কাউকে খুঁজছিলেন ইমরুল, ব্যাট তৈরি সম্পর্কে তার বিশদ ধারণা আছে। এক পর্যায়ে তিনি ঝানতে পারেন হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহিনের কথা। দেশের অনেক ক্রিকেটার তো বটেই, বিদেশি ক্রিকেটারদেরও ব্যাট তৈরি করাসহ ‘মডিফিকেশন’ বা ‘কাস্টমাইজ’ করে আসছেন তিনি বেশ কয়েক বছর ধরেই। দেশের ক্রিকেটারদের কাছ তার পরিচিত ‘ব্যাটের ডাক্তার’ হিসেবে। একটি ব্যাট কারখানার স্বপ্ন ছিল তারও। ব্যস, ইমরুল আর শাহিনের স্বপ্ন মিলে যায় এক বিন্দুতে।

পরে তাদের এই উদ্যোগে যুক্ত হন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। তিন জনের নামের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের নাম ‘এমকেএস স্পোর্টস।’ ব্যাট দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ক্রমে ক্রিকেটের সব সরঞ্জামই তৈরির লক্ষ্য তাদের। কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে রাজশাহীতে। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাট তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিসির অনুমোদনও পেয়ে গেছেন তারা।

আরও পড়ুন: জাবি ছাত্রলীগের ৪০০ জনের কমিটিতে ছাত্রত্ব নেই ৬৭ শতাংশের

উদ্বোধনী আয়োজনের শুরুতে ছিল চমকপ্রদ একটি পর্ব। র‌্যাম্পে হাঁটার মতো করে মঞ্চে ‘এমকেএস’ ব্যাটের প্রদর্শনী মেলে ধরেন ছয় তরুণ ক্রিকেটার আকবর আলি, মাহমুদুল হাসান জয়, পারভেজ হোসেন ইমন, রাকিবুল হাসান, শাহাদাত হোসেন ও রিশাদ হোসেন। ইতিমধ্যেই ‘এমকেএস’ ব্যাটের শুভচ্ছোদূত করা হয়েছে প্রতিভাবান এই ক্রিকেটারদের। ২০২০ যুব বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন আকবর। বাকি পাঁচ ক্রিকেটার এর মধ্যেই খেলে ফেলেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।

এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে ইমরুল স্বপ্নের পরিধি বিশাল। দেশের ক্রিকটের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ব্যাট।

অনুষ্ঠানে কায়েস বলেন, “দুই-আড়াই বছরের পরিকল্পা আমরা বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছি। চেষ্টা করব যে এমকেএস ব্যাট ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে দিতে। সব ক্রিকেটারের ঘরে ঘরে এই ব্যাট থাকবে। এক সময় আমরা দেশের বাইরেও ব্যাটের জোগান দেব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের ভেতরে অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯, হাই পারফরম্যান্স, মেয়েদের দল, লিগে যারা খেলে এবং জাতীয় দল, সবার পাশে থাকার চেষ্টা করব আমরা এবং সেরা মানের ব্যাট ওদের দেওয়ার চেষ্টা করব।”

জানা যায়, ইংল্যান্ড থেকে উঁচু মানের উইলো কাঠ এনে ব্যাটগুলো তৈরি করা হচ্ছে। ব্যাট তৈরির মূল দায়িত্ব আফতাব শাহিনের। ব্যাটের প্রতি প্রবল ঝোঁক থেকে দুই বছর কাঠ নিয়ে পড়াশোনাও করেছেন তিনি। তার কণ্ঠেও শোনা গেল নতুন কিছুর রোমাঞ্চ।

শাহিন বলেন, “অনেক বিদেশি ক্রিকেটারের ব্যাট নিয়ে কাজ করেছি আমি। সাচিন টেন্ডুলকার, ভিরাট কোহলিদের ব্যাট কাস্টমাইজ করার সময় মনে হতো, আমাদের দেশের ক্রিকেটারদের যদি এই মানের ব্যাট দিতে পারতাম! আশা করি এমকেএস ব্যাট দিয়ে এই সস্বপ্ন আমরা পূরণ করতে পারব।”

উল্লেখ্য, ইংলিশ উইলো কাঠের বিভিন্ন গ্রেড থাকে। একদম শীর্ষ গ্রেডের কাঠ খুব বেশি পাওয়া যায় না। সেই গ্রেডের ব্যাটগুলি সাধারণত বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদেরই দেয় ব্যাট কোম্পানিগুলো। ব্যক্তিগত সম্পর্কও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। সম্পর্ক ও যোগাযোগ ভালো বলে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানের কিছু ব্যাট পেয়ে থাকেন তামিম ইকবাল।

দেশের এই সফলতম ব্যাটসম্যান উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়ায় বললেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিতে পারবে এই এমকেএস ব্যাট।

তামিম বলেন, “আমি সত্যিই খুব গর্বিত যে অবশেষে বাংলাদেশের একটি কোম্পানির ব্যাট আসছে। ব্যাট একটা একটি জিনিস, আপনার কাছে যত টাকাই থাকুক, অনেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রিকেটার, তারা ভালো মানের ব্যাট পায় না। আমার মনে আছে, একটা সময় আমরা প্রতিপক্ষের ড্রেসিং রুমে গিয়ে বড় তারকাদের কাছে কাতর হয়ে ব্যাট চাইতাম। অনেক সময় ওরা মুখের ওপর না করে দিত।”

তামিম আরও বলেন, “এমন নয় যে ওদের ব্যাট থেকে আমাদের লোভ হতো। আমরা চাইতাম কারণ ওই মানের ব্যাট পেতাম না। আমাদের আগের যুগেও হয়েছে, আমাদের সময়েও হয়েছে। এখনও অনেকে দিল্লিতে গিয়ে সেখান থেকে ড্রাইভ করে মিরাটে গিয়ে নিজের পছন্দমতো ব্যাট আনতে যায়। কিন্তু খুব ভালো ব্যবহার পায় না। সবদিক বিবেচনায় আমি খুবই খুশি ও গর্বিত যে আমাদের একটি কোম্পানি হচ্ছে।”

এসময় এই প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে চলায় সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখলেন তামিম। “আমি যদিও এই ব্যাট কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত নই, তবু এই ব্যাটের প্রচার ও প্রচারে আমি যে কোনো কিছু ও সবকিছু করব। একটিই কারণ, এটি মেইড ইন বাংলাদেশ।” “ইমরুল ও মিরাজ অনেক বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। আমি আশা করি, এই কোম্পানি খুব ভালো করবে। ক্রিকেট পরিবারে আমরা যারা আছি, ক্রিকেটার ও বোর্ড, সবাই এই কোম্পানির পাশে থাকবে বলে আশা করি।”

এসময় তামিম পরামর্শ দিলেন, শুধু জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের জন্যই নয়, টেনিস বা টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলার ব্যাটসহ সব ধরনের ব্যাট যেন তৈরি করা হয়। 

সাকিব আল হাসানের আশা, একসময় বিদেশের ক্রিকেটাররাও খেলবেন এই এমকেএস ব্যাট দিয়ে।

সাকিব বলেন, “খুবই ভালো উদ্যোগ যে দেশে এরকম একটা ব্যাট প্রস্তুতকারী কোম্পানি হচ্ছে। আমাদের জন্য খুবই গর্বের। মিরাজ ও ইমরুলকে অনেক শুভ কামনা জানাচ্ছি। আশা করি এই ব্র্যান্ড শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও অনেক নাম করবে ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।”

সাকিব আরও বলেন“ওরা যে পরিশ্রম করেছে, বিশেষ করে ইমরুল অনেক পরিশ্রম করেছে, ইংল্যান্ডে গিয়ে উইলো বাছাই করে এনেছে। মিরাজ হয়তো শুধু বিনিয়োগই করেছে (হাসি) তবে ইমরুল অনেক কষ্ট করেছে। সবার জন্য শুভ কামনা। আশা করি, এখান থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট আরও উপকৃত হবে।”

একই রকম গর্ব ও ভালো লাগার প্রতিধ্বনি ছিল নাজমুল হাসান, খালেদ মাহমুদ, জালাল ইউসুন, মাহমুদউল্লাহদের কণ্ঠেও।


মন্তব্য


সর্বশেষ সংবাদ